ঢাকের বাদ্য, কাঁসরধ্বনি, শঙ্খের আওয়াজ আর উলুধ্বনিতে মুখরিত দেশের পূজামণ্ডপগুলো। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাসে ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আবহ। দেবী দুর্গার আগমনে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, আজ শনিবার ও আগামীকাল রবিবার মহাসপ্তমী তিথি পালিত হচ্ছে। এ বছর দুই দিনজুড়ে মহাসপ্তমী তিথি থাকায় আগামীকাল থেকে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এদিন ভক্তরা উপবাস রেখে দেবী দুর্গার চরণে অঞ্জলি দেবেন এবং পূজা শেষে প্রসাদ গ্রহণ করবেন।
রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও চলছে ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনা, কোথাও আবার মাটির প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিক নানা রঙের আলোকসজ্জা। আলো-ছায়ার মায়াবী পরিবেশে দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা দর্শনে ভিড় করছেন বিভিন্ন বয়সী ভক্তরা। করজোড়ে প্রণাম করে দেবীর কাছে নিজেদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও মনের আকাঙ্ক্ষা নিবেদন করছেন তাঁরা।
শুক্রবার মহাষষ্ঠী তিথিতে কল্পারম্ভের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বেলগাছের নিচে ঘট স্থাপন করে দশভুজা দেবী দুর্গাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সন্ধ্যায় বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেবীর আরাধনার আয়োজন। প্রতিটি মণ্ডপে দেবী দুর্গার সঙ্গে অধিষ্ঠিত হয়েছেন দেবী লক্ষ্মী, দেবী সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী জানান, মহাষষ্ঠীর সকালের পর্বকে কল্পারম্ভ বলা হয়। এ সময় পূজার সংকল্প গ্রহণ করা হয় এবং বিল্ববৃক্ষে দেবীর আগমন কল্পনা করে পূজা করা হয়। সন্ধ্যায় বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে দেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম, বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের মণ্ডপ এবং পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও লালবাগ ঋষিপাড়া মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে।
এবার গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের মণ্ডপের ‘জলজ’ থিম দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে। মণ্ডপটির নির্মাতা শিল্পী পার্থ জানান, জল থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি। দেবী দুর্গা জল থেকে আসবেন এবং পূজা শেষে জলেই ফিরে যাবেন—এই ভাবনা থেকেই এবারের থিমের নাম রাখা হয়েছে ‘জলজ’।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০টি বেড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে দুর্গাপূজায় সরকারি অনুদানের পরিমাণ ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন।
এদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি হচ্ছে।
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে পৃথক শুভেচ্ছাবাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় আবহমানকাল ধরে উৎসবমুখর পরিবেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছে, যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ। দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব নয়, এর সঙ্গে মিশে রয়েছে চিরায়ত বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। এ উৎসব সমাজের সব স্তরের মানুষকে সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে। শারদীয় দুর্গোৎসব সত্য ও সুন্দরের আলোকে ভাস্বর হয়ে উঠুক এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হোক বলে তিনি কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার সব ধর্মেরই মূল উপজীব্য। মানবতার কল্যাণও সব ধর্মের অন্যতম প্রধান শিক্ষা। নিজ নিজ ধর্মীয় বিধান ও সংস্কৃতি পালনের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহমর্মিতা বজায় রেখে সমাজে শান্তির পরিবেশ বহাল রাখা সবার জন্য জরুরি। তিনি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের হিন্দু সম্প্রদায় তথা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানান।
ঢাকের তালে, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখরিত পূজামণ্ডপগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ। দেবী দুর্গার আরাধনা, অঞ্জলি, প্রসাদ গ্রহণ ও প্রতিমা দর্শনের মধ্য দিয়ে মহাসপ্তমীর এই আয়োজন ঘিরে ভক্তদের মধ্যে বিরাজ করছে আনন্দ ও ভক্তির আবহ।
মতামত