চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, অর্থবছরের প্রথমার্ধে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। তবে বাস্তবে আদায় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। এর ফলে ছয় মাসেই মোট রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। যদিও এই সময়ের মধ্যে গড়ে ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তবুও তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যথেষ্ট হয়নি।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনটি প্রধান রাজস্ব খাতের মধ্যে আয়কর খাতে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। প্রথম ছয় মাসে আয়কর খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৬১ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। ফলে আয়কর খাতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা, যা মোট রাজস্ব ঘাটতির অর্ধেকেরও বেশি।
এ ছাড়া শুল্ক খাতে এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৫ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এতে শুল্ক খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ভ্যাট খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা, যেখানে আদায় হয়েছে ৭০ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। ফলে ভ্যাট খাতে ঘাটতির পরিমাণ হয়েছে ১০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনলাইনভিত্তিক কর আদায় ব্যবস্থা জোরদারসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের মতে, চলমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি এনবিআরের অভ্যন্তরীণ আন্দোলন ও প্রশাসনিক অচলাবস্থাও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা বাস্তব চাহিদা ও বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। করজালের সীমিত বিস্তার, কর ফাঁকি, এবং রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এ ছাড়া অর্থবছরের মাঝপথে এক দফায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেওয়ায় বাস্তবতার সঙ্গে লক্ষ্যের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়েছে বলেও তারা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় সংকোচন কিংবা ঋণনির্ভরতার পথে যেতে হতে পারে, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
মতামত