যুগের পর যুগ ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড ঘটলেও সেসব ঘটনার সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার এক গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতাকেই প্রকাশ করে। সর্বশেষ দিপু হত্যাকাণ্ড—ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত—এই বিচারহীনতার ধারাবাহিকতারই ভয়াবহ প্রকাশ, যেখানে আইনের বদলে উন্মত্ত জনতা বিচারকের ভূমিকা নিয়েছে। প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি আদৌ আইনের শাসনের পথে আছি?
বিচারহীনতার পেছনের কাঠামোগত কারণ
১. তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা: সংখ্যালঘু নির্যাতনের অনেক ঘটনায় মামলা সঠিকভাবে রুজু হয় না, সাক্ষ্য সংগ্রহে গাফিলতি থাকে, কিংবা তদন্ত প্রভাবিত হয় স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে। ফলে মামলা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে বা খালাসে শেষ হয়।
২. রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব: সংখ্যালঘু নির্যাতন অনেক সময় ‘সংবেদনশীল’ বলে চিহ্নিত হয়। শাসকগোষ্ঠী পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপস করে। ভোট-রাজনীতির হিসাব ন্যায়বিচারের ওপর প্রাধান্য পায়।
৩. ধর্ম অবমাননা আইনের অপব্যবহার: দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ বহু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি দখল বা সামাজিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অভিযোগ উঠার আগেই জনতা ‘বিচারক’ হয়ে ওঠে—দিপু হত্যাকাণ্ডে এটাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
৪. সামাজিক নীরবতা ও স্বাভাবিকীকরণ: সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা অনেক ক্ষেত্রে ‘ঘটেই’—এমন এক বিপজ্জনক স্বাভাবিকতার মধ্যে পড়ে গেছে। মূলধারার প্রতিবাদ দুর্বল হলে অপরাধীরা আরও সাহস পায়।
দিপু হত্যাকাণ্ড: একটি সতর্ক সংকেত
দিপু হত্যাকাণ্ড কেবল একজন মানুষের প্রাণহানি নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো অধিকার কারও নেই। রাষ্ট্রের দায় ছিল অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সত্য উদঘাটন করা। সেই দায় পালনে ব্যর্থতা আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আমরা কোন পথে এগোচ্ছি
যদি বিচারহীনতা চলতে থাকে, সমাজ এগোবে ভয়ের রাজত্বের দিকে—যেখানে সংখ্যালঘু পরিচয় নিজেই অপরাধ হয়ে উঠবে। এতে শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংখ্যাগুরু সমাজও নিরাপদ থাকবে না; কারণ আজ যে উন্মত্ততা ‘অন্যের’ বিরুদ্ধে, কাল তা যে কারও বিরুদ্ধে ফিরতে পারে।
অন্যদিকে, যদি আমরা সত্যিই আইনের শাসনের পথে হাঁটতে চাই, তবে দরকার
•সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত
•ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা
•দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙা
•রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ উদ্যোগে সহনশীলতা ও মানবাধিকারের শিক্ষা
দিপু হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে শেষ সুযোগের মতো দাঁড়িয়ে আছে—
এখনই যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হয়, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। প্রশ্ন একটাই: আমরা কি মানুষ হিসেবে, রাষ্ট্র হিসেবে সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?
মতামত