চট্টগ্রামের ১ নম্বর গেট এলাকায় এক হিন্দু যুবকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বর্ণনা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জনি রায় নামের এক হিন্দু যুবক নিজের ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেছেন, রমজান মাসে দুপুরে ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি দোকান থেকে বনরুটি কিনে দোকানের ভেতরের আড়াল করা কোণায় দাঁড়িয়ে খাওয়ার সময় দোকানদার ও উপস্থিত কয়েকজনের আচরণের শিকার হতে হয়েছে তাকে। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত তার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে অস্বস্তিকর ও অপমানজনক পরিস্থিতিতে গড়ায়।
ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে জনি রায় লেখেন, ঘটনাটি ঘটেছে দুপুরের দিকে চট্টগ্রামের ১ নম্বর গেট এলাকায়। রমজান মাসে দিনের বেলায় অনেক খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় তিনি কিছু খাওয়ার উদ্দেশ্যে “রফিক সওদাগরের দোকান” নামে একটি দোকানে যান। সেখান থেকে ১৫ টাকার একটি মোরব্বা বন কেনেন। দোকানের ভেতরে মূল অংশের বাইরে একটি আড়াল করা অংশ ছিল, যেখানে পরিত্যক্ত বোতল, কিছু জিনিসপত্র এবং দু’টি বেঞ্চ রাখা ছিল। বাইরে থেকে সেটি খুব সহজে চোখে পড়ে না। জনি রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে চুপচাপ বন খেতে শুরু করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রথম কামড় দিতেই বুঝতে পারেন রুটিটি বেশ শক্ত। তিনি হালকা মজা করেই দোকানদারকে বলেন, “মামা, জিনিসটা এত শক্ত কেন? ডেট তো গতকালের।” তার দাবি, কথাটি তিনি সিরিয়াসভাবে বলেননি, বরং হালকা রসিকতার ভঙ্গিতেই বলেছিলেন। কিন্তু এরপরই দোকানদারের প্রতিক্রিয়া তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। জনির অভিযোগ, দোকানদার উত্তরে বলেন, “টাকা দিয়ে পাচ্ছেন তাই খান।” পরে আরও বলেন, “আমার অনুমতি নিয়ে দোকানে খাচ্ছেন?”
জনি রায় লিখেছেন, তিনি তখন দোকানদারকে জানান যে তিনি তো দোকানের ভেতরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন, এতে সমস্যা কোথায়। কিন্তু এরপর তাকে বলা হয়, রমজান মাসে দোকানের ভেতরে খাওয়া যাবে না, খেতে হলে বাইরে গিয়ে খেতে হবে। তিনি যুক্তি দেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেলে অনেকের চোখে পড়বে, অথচ তিনি তো দোকানের আড়াল করা অংশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার দাবি, তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি।

ঘটনার ব্যাখ্যায় জনি রায় বলেন, তার প্রশ্ন ছিল একেবারেই সাধারণ—যদি দোকান খোলা থাকে, সেখানে সিগারেট–বিড়ি বিক্রি হয়, তাহলে দোকানের এক কোণায় দাঁড়িয়ে একটি বনরুটি খেলে আপত্তি কোথায়? তিনি দাবি করেন, তিনি কাউকে উস্কে দিতে চাননি, কারও ধর্মকে অসম্মানও করতে চাননি। তিনি শুধু ক্ষুধার তাড়নায় কিছু খেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুরো ঘটনার শেষে তার মনে হয়েছে, তার ধর্মীয় পরিচয়টাই যেন সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে তিনি আরও স্পষ্ট করে লেখেন, তিনি বিচার চান না, ঝামেলাও চান না। তিনি শুধু একটি প্রশ্ন সমাজের সামনে রেখে যেতে চান—এ ধরনের ঘটনা কি সত্যিই বিচ্ছিন্ন, নাকি সংখ্যালঘুদের প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতারই অংশ? এই প্রশ্নই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর বহু সাধারণ সনাতনী নেটিজেন বিষয়টির প্রতিবাদ জানান এবং এটিকে সংখ্যালঘুদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দেন।
ঘটনাটি নিয়ে ফেসবুকে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই জনি রায়ের অভিজ্ঞতার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—যদি দোকানটি খোলা থাকে এবং খাবার বিক্রি হয়, তাহলে একজন ক্রেতা তা খেতে পারবে না কেন? একজন নেটিজেন মন্তব্য করেন, “খাবার বিক্রি করবে, আবার খেতে দেবে না—এ কেমন দ্বিচারিতা? ধর্মের নামে মানুষকে ছোট করা বন্ধ হওয়া উচিত।” আরেকজন লেখেন, “রমজানের প্রতি সম্মান দেখানো এক বিষয়, কিন্তু একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে ধর্ম জিজ্ঞেস করে অপমান করা সম্পূর্ণ অন্যায়।” অন্য এক সনাতনী ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “এগুলো ছোট ঘটনা নয়, এভাবেই প্রতিদিন সংখ্যালঘুদের মনে ভয় ও অপমানের বোধ তৈরি করা হয়।” আরও একজন লেখেন, “যদি ঘটনাটি সত্য হয়, তাহলে প্রশাসনের নজর দেওয়া উচিত। অন্তত এমন আচরণ যাতে আর কারও সঙ্গে না হয়।”
সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, রমজান মাসে সংবেদনশীলতা বজায় রাখা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তার নামে ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করে কাউকে অপমান করা বা দোকান থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
মতামত