ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাতে। চট্টগ্রাম থেকে কর্মস্থল কুমিল্লার উদ্দেশে রাত ১১টায় রওনা হয়েছিলেন বুলেট। সর্বশেষ রাত ১টা ২৫ মিনিটে স্ত্রী উর্মি হীরার সাথে তার ফোনে কথা হয়। এরপর থেকেই তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে উৎকণ্ঠিত স্ত্রী ভোররাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আকুতি জানান এবং পুলিশের দ্বারস্থ হন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, শুরু থেকেই থানা পুলিশ বিষয়টি নিয়ে এক প্রকার রশি টানাটানি ও উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে।
আজিজ ম্যানশন ও ডিবির লোকেশন ট্র্যাকিং
যখন থানা পুলিশ মামলার সীমানা আর তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করছিল, তখন ভুক্তভোগীর বন্ধুরা ডিবির সহায়তায় বুলেটের মোবাইল লোকেশন শনাক্ত করেন। তথ্যপ্রযুক্তি বলছে, ভোর ৫টা ৩০ মিনিট নাগাদ বুলেটের ফোনটি কুমিল্লা সদর উপজেলার চৌয়ারা বাজার এলাকার ‘আজিজ ম্যানশন’ সংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় ছিল। ডিবির কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছিলেন যে, ২০০ মিটারের মধ্যেই তাকে পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু এখন এই ‘আজিজ ম্যানশন’। প্রশ্ন উঠেছে, রাত দেড়টায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া একজন মানুষের ফোন ভোর সাড়ে পাঁচটায় ওই বিশেষ এলাকায় কেন সক্রিয় ছিল? অথচ পুলিশ সেখানে তাৎক্ষণিক কোনো অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি।
পুলিশের দায়সারা ভূমিকা
তদন্তের দায়িত্ব নিয়ে কোতোয়ালী মডেল থানার এসআই ও ওসির বক্তব্যে ফুটে উঠেছে চরম সমন্বয়হীনতা। দুপুরে যখন এক সংবাদকর্মী তদন্তের অগ্রগতি জানতে চান, তখন সংশ্লিষ্ট এসআই জানান তার কাছে এখনো জিডির কপিই পৌঁছায়নি। অন্যদিকে, ‘আজিজ ম্যানশন’ এলাকায় অভিযানের কথা বললে পুলিশ একে ‘অন্যের এলাকা’ বলে দায় এড়িয়ে যায়। পরিবারের দাবি, পুলিশ যদি লোকেশন পাওয়ার পরপরই তৎপর হতো, তবে হয়তো বুলেট বৈরাগীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো।
হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা?
বুলেটের মরদেহ পাওয়া গেছে পদুয়ার বাজার ও আলেখারচরের মধ্যবর্তী আইরিশ হোটেলের সামনে। পুলিশের একাংশ একে বাস থেকে নামার সময় দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা করলেও পারিপার্শ্বিক আলামত তা বলছে না। যদি দুর্ঘটনা হতো, তবে তার সাথে থাকা ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ঘটনাস্থলেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু তার কোনো মূল্যবান জিনিসই পাওয়া যায়নি। ছিনতাইকারী নাকি পূর্ব শত্রুতার জেরে কেউ তাকে অনুসরণ করে বাস থেকে নামিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে, তা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
শোকাতুর পরিবার ও বিচারপ্রার্থনা
মাত্র এক বছর সাত মাস আগে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তার এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী উর্মি হীরা। শনিবার দুপুরে হাসপাতালের মর্গে স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। টুঙ্গিপাড়ার সন্তান বুলেট বৈরাগী তার কর্মনিষ্ঠার জন্য পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় সচেতন মহল ও তার সহকর্মীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং আজিজ ম্যানশন কেন্দ্রিক রহস্য উদঘাটনের জোর দাবি জানিয়েছেন। কাস্টমস কর্মকর্তার এই ‘খুন’ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে পুনরায় বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।
মতামত