শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
হিন্দুস নিউজ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেন কথা বলেননি সত্যজিৎ রায়


| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেন কথা বলেননি সত্যজিৎ রায়
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—এই দুইয়ের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই এক প্রকার কৌতূহলোদ্দীপক নীরবতা লক্ষ্য করেছেন ইতিহাসবিদ ও শিল্প সমালোচকেরা। ১৯৭১ সালে যখন পূর্ব বাংলার মাটি সাধারণ মানুষের রক্তে ভিজে যাচ্ছিল, যখন ওপার বাংলায় বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ শিল্পী-কলাকুশলীরা রাজপথে নেমেছিলেন, তখন সত্যজিতের মতো ব্যক্তিত্বের এই অবস্থান নিয়ে আজও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।


​কলকাতার রাজপথে অনুপস্থিত বিশ্বনন্দিত নির্মাতা

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল-মিটিংয়ে মুখর ছিল। অন্নদাশঙ্কর রায়, মৃণাল সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিরা বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সত্যজিৎ রায়কে কোনো সভা বা মিছিলে দেখা যায়নি। এমনকি মৃণাল সেন ও সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্বয়ং তাঁর বাসভবনে গিয়েও তাঁকে জনসম্মুখে আনতে পারেননি। কবি দাউদ হায়দারের লেখায় এই আক্ষেপ ফুটে উঠেছিল স্পষ্টভাবে— প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর ‘আইভরি টাওয়ার’ বা নিভৃতচারী মনোভাব নিয়ে।

​বিজয়া রায়ের দিনলিপি ও ব্যক্তিগত নিস্পৃহতা

Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়ের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘আমাদের কথা’ থেকে জানা যায়, যুদ্ধ চলাকালীন সত্যজিৎ ব্যস্ত ছিলেন তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ চলচ্চিত্রের কাজে। সেখানে জেমস বন্ডের সিনেমা বা হিচককের ‘সাইকো’ দেখার উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ খুঁজে পাওয়া যায় না। শরণার্থীদের ছবি দেখেও তাঁর নীরব থাকা ছিল অনেকের কাছেই বিস্ময়ের।

​দেশভাগ ও আদর্শিক সংঘাতের তত্ত্ব

সত্যজিতের এই উদাসীনতার পেছনে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণ করেন সমালোচকেরা। একটি জোরালো মত হলো, সত্যজিৎ রায় ১৯৪৭ সালের ধর্মভিত্তিক দেশভাগের ঘোর বিরোধী ছিলেন। পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলার মানুষ যখন আবার সংকটে পড়ে, তখন হয়তো সেই পুরনো ক্ষোভ বা আদর্শিক অবস্থান থেকেই তিনি নীরবতা পালন করেছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন অখণ্ড ভারতীয় ইউনিয়নে (Indian Union) বিশ্বাসী। সম্ভবত সে কারণেই তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ বিশ্বভ্রমণ করলেও পাশের দেশ বাংলাদেশে কখনও পা রাখেনি। এমনকি বাংলাদেশের অমূল্য সব স্বর্ণমুদ্রা বা ঐতিহ্য পাচার হয়ে গেলেও ফেলুদাকে সেদিকে নজর দিতে দেখা যায়নি।

​ভাষা ও ঐতিহ্যের লড়াই: কলকাতা বনাম ঢাকা

১৯৭২ সালে ঢাকা সফরে এসে পল্টন ময়দানে দেওয়া ভাষণে সত্যজিৎ রায় বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর গভীর মমত্বের কথা জানিয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তিনি অভিহিত করেছিলেন কেবল ‘ইতিহাসের চাকা ঘুরে যাওয়া’ হিসেবে। অনেকের ধারণা, ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের উদয় কলকাতার সাংস্কৃতিক আধিপত্যের জন্য হুমকি হতে পারে—এমন এক সূক্ষ্ম আশঙ্কা হয়তো তাঁর অবচেতনে কাজ করছিল। কলকাতার ঐতিহ্য রক্ষার যে সংগ্রাম তিনি ফেলুদার মাধ্যমে মগনলাল মেঘরাজদের বিরুদ্ধে দেখিয়েছেন, তাতে হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো স্থান ছিল না।

​ব্যর্থ প্রচেষ্টা ও শৈল্পিক সততা

অবশ্য আশির দশকে এক সাক্ষাৎকারে এবং কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনকে লেখা এক চিঠিতে তিনি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুপ্ত ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার অজুহাতে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। অস্ট্রেলীয় চলচ্চিত্র সমালোচক জন ডব্লিউ হুডের মতে, সত্যজিৎ হয়তো এত বড় ঐতিহাসিক ক্যানভাসকে সেলুলয়েডে ধরার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।

​পরিশেষে বলা যায়, সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্প ও চিন্তার প্রতি সর্বদা সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন। সেই সততা থেকেই কি তাঁর এই দীর্ঘ নীরবতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল কোনো অভিমানী আদর্শ—তা আজও চলচ্চিত্র ও ইতিহাস প্রেমীদের কাছে এক অমীমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।


তথ্যঋণ: সত্যজিৎ রায়ের প্রবন্ধ সংগ্রহ; বিজয়া রায়ের আমাদের কথা ও বিভিন্ন পত্রিকা

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেন কথা বলেননি সত্যজিৎ রায়

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image
বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—এই দুইয়ের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই এক প্রকার কৌতূহলোদ্দীপক নীরবতা লক্ষ্য করেছেন ইতিহাসবিদ ও শিল্প সমালোচকেরা। ১৯৭১ সালে যখন পূর্ব বাংলার মাটি সাধারণ মানুষের রক্তে ভিজে যাচ্ছিল, যখন ওপার বাংলায় বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ শিল্পী-কলাকুশলীরা রাজপথে নেমেছিলেন, তখন সত্যজিতের মতো ব্যক্তিত্বের এই অবস্থান নিয়ে আজও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।


​কলকাতার রাজপথে অনুপস্থিত বিশ্বনন্দিত নির্মাতা

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল-মিটিংয়ে মুখর ছিল। অন্নদাশঙ্কর রায়, মৃণাল সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিরা বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সত্যজিৎ রায়কে কোনো সভা বা মিছিলে দেখা যায়নি। এমনকি মৃণাল সেন ও সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্বয়ং তাঁর বাসভবনে গিয়েও তাঁকে জনসম্মুখে আনতে পারেননি। কবি দাউদ হায়দারের লেখায় এই আক্ষেপ ফুটে উঠেছিল স্পষ্টভাবে— প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর ‘আইভরি টাওয়ার’ বা নিভৃতচারী মনোভাব নিয়ে।

​বিজয়া রায়ের দিনলিপি ও ব্যক্তিগত নিস্পৃহতা

সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়ের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘আমাদের কথা’ থেকে জানা যায়, যুদ্ধ চলাকালীন সত্যজিৎ ব্যস্ত ছিলেন তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ চলচ্চিত্রের কাজে। সেখানে জেমস বন্ডের সিনেমা বা হিচককের ‘সাইকো’ দেখার উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া বা আবেগের বহিঃপ্রকাশ খুঁজে পাওয়া যায় না। শরণার্থীদের ছবি দেখেও তাঁর নীরব থাকা ছিল অনেকের কাছেই বিস্ময়ের।

​দেশভাগ ও আদর্শিক সংঘাতের তত্ত্ব

সত্যজিতের এই উদাসীনতার পেছনে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণ করেন সমালোচকেরা। একটি জোরালো মত হলো, সত্যজিৎ রায় ১৯৪৭ সালের ধর্মভিত্তিক দেশভাগের ঘোর বিরোধী ছিলেন। পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলার মানুষ যখন আবার সংকটে পড়ে, তখন হয়তো সেই পুরনো ক্ষোভ বা আদর্শিক অবস্থান থেকেই তিনি নীরবতা পালন করেছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন অখণ্ড ভারতীয় ইউনিয়নে (Indian Union) বিশ্বাসী। সম্ভবত সে কারণেই তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ফেলুদা’ বিশ্বভ্রমণ করলেও পাশের দেশ বাংলাদেশে কখনও পা রাখেনি। এমনকি বাংলাদেশের অমূল্য সব স্বর্ণমুদ্রা বা ঐতিহ্য পাচার হয়ে গেলেও ফেলুদাকে সেদিকে নজর দিতে দেখা যায়নি।

​ভাষা ও ঐতিহ্যের লড়াই: কলকাতা বনাম ঢাকা

১৯৭২ সালে ঢাকা সফরে এসে পল্টন ময়দানে দেওয়া ভাষণে সত্যজিৎ রায় বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর গভীর মমত্বের কথা জানিয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তিনি অভিহিত করেছিলেন কেবল ‘ইতিহাসের চাকা ঘুরে যাওয়া’ হিসেবে। অনেকের ধারণা, ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের উদয় কলকাতার সাংস্কৃতিক আধিপত্যের জন্য হুমকি হতে পারে—এমন এক সূক্ষ্ম আশঙ্কা হয়তো তাঁর অবচেতনে কাজ করছিল। কলকাতার ঐতিহ্য রক্ষার যে সংগ্রাম তিনি ফেলুদার মাধ্যমে মগনলাল মেঘরাজদের বিরুদ্ধে দেখিয়েছেন, তাতে হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো স্থান ছিল না।

​ব্যর্থ প্রচেষ্টা ও শৈল্পিক সততা

অবশ্য আশির দশকে এক সাক্ষাৎকারে এবং কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনকে লেখা এক চিঠিতে তিনি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুপ্ত ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার অজুহাতে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। অস্ট্রেলীয় চলচ্চিত্র সমালোচক জন ডব্লিউ হুডের মতে, সত্যজিৎ হয়তো এত বড় ঐতিহাসিক ক্যানভাসকে সেলুলয়েডে ধরার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।

​পরিশেষে বলা যায়, সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্প ও চিন্তার প্রতি সর্বদা সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন। সেই সততা থেকেই কি তাঁর এই দীর্ঘ নীরবতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল কোনো অভিমানী আদর্শ—তা আজও চলচ্চিত্র ও ইতিহাস প্রেমীদের কাছে এক অমীমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।


তথ্যঋণ: সত্যজিৎ রায়ের প্রবন্ধ সংগ্রহ; বিজয়া রায়ের আমাদের কথা ও বিভিন্ন পত্রিকা


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেন কথা বলেননি সত্যজিৎ রায়
0:00 0:00
1.0x