২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর, শারদীয় দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরীফ রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরে তদন্তে উঠে আসে, কুমিল্লার ওই ঘটনায় ইকবাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি কোরআন শরীফটি প্রতিমার পাশে রেখে এসেছিলেন। তবে ঘটনার শুরু থেকেই অনেক সচেতন মানুষ মনে করেছিলেন, কোনো হিন্দু ভক্ত ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কাজ করতে পারেন না। তবুও সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
কুমিল্লা থেকে শুরু হয়ে রংপুর, চট্টগ্রাম, জয়পুরহাট, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে উগ্র সহিংসতা। বহু মন্দির, পূজামণ্ডপ ও হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি আক্রান্ত হয়। সেই সময় মন্দির ও প্রতিমা রক্ষায় এগিয়ে এসে প্রাণ হারান মানিক সাহা, যতন সাহা, প্রান্ত দাস, দিলীপ দাসসহ কয়েকজন নিরীহ হিন্দু। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তারা নিজেদের ধর্মীয় উপাসনালয় রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়েই নিহত হন।
এ ঘটনায় অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন উঠে, যখন পরে প্রমাণিত হলো কোরআন রাখার ঘটনায় ইকবাল হোসেন জড়িত ছিলেন, তখন কেন তার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী কোনো প্রতিবাদ হয়নি? কেন তার বাড়ি বা পরিবার আক্রমণের শিকার হয়নি? সমালোচকদের মতে, এতে স্পষ্ট হয় যে হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু সম্প্রদায়কে আঘাত করা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পবিত্র প্রার্থনার সময়ে হামলা চালানো চরম অমানবিকতার পরিচায়ক। নামাজ, গির্জার প্রার্থনা কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় আচার চলাকালে হামলার ঘটনা যেমন বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেয়, তেমনি দুর্গাপূজার সময় পূজামণ্ডপে হামলাও বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে, নিহতদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও তাঁদের আত্মত্যাগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার বিষয়ে হিন্দু সমাজের ভেতরেও আত্মসমালোচনার সুর শোনা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, যারা মন্দির ও ধর্মীয় উপাসনালয় রক্ষায় জীবন দিয়েছেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান জানানো হয়নি। প্রতিবছর দুর্গাপূজা বা অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাঁদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা, স্মৃতিচিত্র প্রদর্শন কিংবা পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ আরও ব্যাপকভাবে নেওয়া উচিত।
সচেতন মহলের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মপরিচয়, সামাজিক ঐক্য ও ইতিহাসচেতনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পূজামণ্ডপগুলো শুধু বিনোদনের জায়গা না হয়ে সমাজের আত্মসচেতনতা ও ঐক্যের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে বলে তারা মনে করেন।
আগামী দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ২০২১ সালের সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে বিশেষ আয়োজনের আহ্বানও জানানো হচ্ছে। অনেকেই আশা করছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হলে সমাজে দায়িত্ববোধ, ঐক্য ও সচেতনতা আরও দৃঢ় হবে।
মতামত