সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ভালুকার মেহরাবাড়ী এলাকায় লাবিব গ্রুপের সুলতানা সুয়েটার্স লিমিটেড কারখানায় এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার আড়ালে ধর্মীয় বিদ্বেষ?
নিহত বজেন্দ্র বিশ্বাস সিলেট সদর উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের পবিত্র বিশ্বাসের ছেলে। তিনি অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। সহকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, বজেন্দ্র কপালে তিলক পরতেন এবং গলায় তুলসী মালা রাখতেন। নিয়মিত কৃষ্ণনাম জপ করতেন। তার এই ধর্ম পালন নিয়ে অভিযুক্ত নোমান মিয়া ও আরও কয়েকজন তাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন। তাকে ‘ইসকন’ সদস্য উল্লেখ করে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দেওয়া হতো এবং বাংলাদেশে থাকা নিয়ে কটূক্তি করা হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আনসার সদস্য হিন্দু'স নিউজকে জানান, ঘটনার আগে ধর্ম পালন নিয়ে নোমানের সাথে বজেন্দ্রর বাকবিতণ্ডা হয়। নোমান তাকে মালা ও তিলক ত্যাগ করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। বজেন্দ্র এর প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, “তোরা যেমন ৫ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়তে পারবি না, আমিও আমার ধর্ম ছাড়তে পারব না।” এই তর্কের জেরেই উত্তেজনা ছড়ায়।

পুলিশ ও অভিযুক্তের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আনসার সদস্য নোমান ও বজেন্দ্র একসঙ্গে বসেছিলেন এবং অসাবধানতাবশত গুলি বের হয়ে যায়। তবে আনসার বাহিনীর অস্ত্র চালনার নিয়ম ও প্রটোকল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাহিনীরই অন্য সদস্যরা।
২০১৮ ব্যাচের একজন আনসার সদস্য হিন্দু'স নিউজকে জানান, সফিপুরের ট্রেনিং অনুযায়ী, শত্রু ব্যতীত কারো দিকে অস্ত্র তাক করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ ছাড়া শটগানে গুলি লোড করার কোনো নিয়ম নেই। ডিউটিরত অবস্থায় গুলি কেবল ‘প্রসেস’ অবস্থায় থাকার কথা। কিন্তু ঘটনার সময় নোমানের অস্ত্রটি ‘লোড’ করা ছিল, যা হত্যার উদ্দেশ্যকেই ইঙ্গিত করে।
সাক্ষীদের মুখ বন্ধ করার অভিযোগ
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বা একই ক্যাম্পে থাকা আনসার সদস্যদের বয়ান পরিবর্তন করার জন্য চাপের অভিযোগ উঠেছে। সূত্র বলছে, ঘটনার পরপরই ক্যাম্পের পিসি (প্লাটুন কমান্ডার) আজুর আলী সকল সদস্যকে নির্দেশ দেন, সাংবাদিক বা পুলিশের কাছে যেন সবাই একই কথা বলেন—যে এটি একটি দুর্ঘটনা।
নিহতের এক সহকর্মী জানান, প্রথমে তার ব্যাচমেট তাকে জানিয়েছিল যে নোমান ইচ্ছেকৃতভাবে গুলি লোড করে বজেন্দ্রকে গুলি করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে পিসি ও অন্যদের চাপে সে তার বক্তব্য পাল্টে ফেলে এবং বিষয়টিকে ‘মজার ছলে দুর্ঘটনা’ বলে চালানোর চেষ্টা করে।

এদিকে নিহতের পরিবারের দাবি, সম্প্রতি দিপু দাস হত্যার প্রতিবাদ করায় বজেন্দ্রর সাথে অভিযুক্তের মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছিল। তারা দাবি করছেন, বজেন্দ্রকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত নোমান মিয়াকে আটক করা হয়েছে। তিনি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বালুটুরি বাজার এলাকার লুৎফর রহমানের ছেলে।
ভালুকা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আব্দুল মালেক জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হচ্ছে। এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো আক্রোশ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
মতামত