ভারতের বহুল প্রতিক্ষীত মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র ‘রামায়ণ’-এর ট্রেলার মুক্তির পর থেকেই পৌরাণিক সর্বজনীন আরাধ্যা চরিত্র মা সীতার ভূমিকার কাস্টিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরণের আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। খ্যাতনামা অভিনেত্রী সাই পল্লবীকে এই পবিত্র চরিত্রে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে দর্শক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। একপক্ষ যেখানে অভিনেত্রীর সহজাত শালীনতা, মেকআপহীন সৌন্দর্য ও অভিনয়দক্ষতাকে মা সীতার আদর্শ ও সরল রূপ রূপায়ণের জন্য যথার্থ মনে করছেন, অন্যপক্ষ মনে করছেন হিন্দু ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত সীতার চিরাচরিত রূপময় বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বর্তমান কাস্টিং পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে যে, এটি অভিনেত্রীর ব্যক্তি রূপের সমালোচনা নয়, বরং কোটি মানুষের আবেগ ও ধর্মগ্রন্থের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল কাস্টিংয়ের দাবি। আবার বহু দর্শক পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, কোনো পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক মহীয়সী চরিত্র ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে বাহ্যিক মেকআপের চেয়ে অভিনয় দক্ষতা, ভাবাবেগ প্রকাশ এবং ব্যক্তিত্বের গভীরতাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
এই তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে সাই পল্লবীর প্রদান করা একটি হৃদয়গ্রাহী পুরোনো সাক্ষাৎকার। চলচ্চিত্র জগতে আত্মপ্রকাশের পূর্বে নিজের শারীরিক অসম্পূর্ণতা ও ত্বকের সমস্যা নিয়ে যে মানসিক সংগ্রামের মুখোমুখি তিনি হয়েছিলেন, তা অত্যন্ত সততার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেই আলাপে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') প্রথাগত সৌন্দর্যের মানদণ্ডের বাইরে গিয়ে নিজের স্বাভাবিক রূপকে ধারণ করার এক বিরল আত্মবিশ্বাসের গল্প সেখানে ফুটে ওঠে, যা সাধারণ দর্শকদের অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। তিনি প্রকাশ করেছিলেন যে, চলচ্চিত্রে আসার আগে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ব্রণ ও রোসেসিয়া নামক ত্বকের জটিলতায় ভুগেছেন এবং এই শারীরিক কারণে এতটাই হীনমন্যতায় ভুগতেন যে মানুষের মুখোমুখি হতেও ইতস্তত বোধ করতেন। প্রেমাম চলচ্চিত্রের আগে অসংখ্য ফেয়ারনেস ক্রিম ব্যবহার করেও কোনো সুফল না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি এবং মনে করতেন মানুষ তার চোখের ভাষাকে উপেক্ষা করে কেবল তার ত্বকের ত্রুটিগুলোর দিকেই কৌতূহল নিয়ে তাকায়।
তবে ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মালয়ালম ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ‘প্রেমাম’ তার দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনধারা আমূল বদলে দেয়। তিনি জানিয়েছেন, দর্শক যখন তাকে কৃত্রিমতাহীন ও স্বাভাবিক রূপেই সাদরে গ্রহণ করে নেন, তখনই তিনি অনুভব করেন যে প্রকৃত সৌন্দর্য কোনো কৃত্রিম প্রসাধন বা নিখুঁত ত্বকে নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও স্বকীয়তার মধ্যেই অবস্থান করে। জীবনের প্রথম ছবির জন্য তামিল ইন্ডাস্ট্রি নির্বাচন না করে মালয়ালম সিনেমা বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ব্যর্থতার ভয় থাকলেও সেখানে নিজের স্বাভাবিক উপস্থিতি তুলে ধরার স্বাধীনতা ছিল, যদিও পরবর্তীতে এই ছবিটির অভূতপূর্ব সাফল্য তাকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়। নিজের বিশ্বাসের জায়গায় অটল থেকে তিনি ইতিপূর্বে ২ কোটি রুপির একটি ফেয়ারনেস ক্রিমের লোভনীয় বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যা তার নীতিবোধ ও বাণিজ্যিক মোহের ঊর্ধ্বে থাকার এক বিরল দৃষ্টান্ত। বাহ্যিক সৌন্দর্যের সংকীর্ণ বর্ণবাদী ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এবং সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়ে তার গ্রহণ করা সেই পদক্ষেপ আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। বর্তমানের রামায়ণ কেন্দ্রিক কাস্টিং বিতর্কের মাঝে অভিনেত্রীর এই ইতিবাচক জীবনদর্শন ও আত্মবিশ্বাসের বার্তাটি নতুন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, যা সার্বিক মানবাধিকার ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য বার্তা বহন করে।
মতামত