উচ্ছাসের এই দীর্ঘ যাত্রার পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এক ঐতিহ্যবাহী সনাতন পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকায়। ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষাতেই ৩.৯৬ সিজিপিএ অর্জন করার বিরল কৃতিত্ব দেখান। সকাল থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে নিরলস গবেষণা এবং তার পরপরই টিউশন করার কঠিন দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখতে হয়েছে তাঁকে। নিজের পড়াশোনা, আইইএলটিএস পরীক্ষা এবং বিদেশে আবেদনের সমস্ত খরচ তিনি স্বাবলম্বী হয়ে নিজেই মেটাতেন।
"ছাত্রজীবনে সব সময় চেষ্টা করেছি নিজের খরচ নিজেই চালাতে, যাতে পরিবারের ওপর চাপ না পড়ে। স্নাতকোত্তরে ওঠার পর ২০২৪ সালে বাবার ক্যানসার ধরা পড়লে জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ শুরু হয়। দিনের বেলা ল্যাবে কাজ, বিকেলে টিউশন আর রাতে ক্যানসার আক্রান্ত বাবার সেবা—সব মিলিয়ে চরম পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তবে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় সেই কঠিন সময় পার করে আসার পর আর কোনো চ্যালেঞ্জকেই অসম্ভব মনে হয়নি।" — উচ্ছাস সিকদার।
(News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')
মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্ছাসের গবেষণার মূল বিষয় ‘হিউম্যান গাট মাইক্রোবায়োটা’ বা মানবদেহের অন্ত্রে থাকা অণুজীবসংক্রান্ত গবেষণা। এই সর্বাধুনিক গবেষণা ভবিষ্যতে মানবদেহের রোগীদের নিজস্ব শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ব্যক্তিগত চিকিৎসা নির্ধারণ এবং বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো মারাত্মক জটিল রোগের পূর্বলক্ষণ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। ইতিপূর্বে তিনি চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নকালে জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ফিজিওলজিক্যাল সায়েন্সেসে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করে ওষুধ গবেষণায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সুগভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখেও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পিতা কানু সিকদারের প্রয়াণের পর শোকের সমুদ্রে ভেসে গিয়েও তিনি বিভাগীয় শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় নিজেকে পুনরায় ধরে রাখেন। তাঁর এই অদম্য যাত্রাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, পরম শোক ও ব্যক্তিগত বিপদের মধ্যেও উচ্ছাস যেভাবে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে নিজের কর্তব্য পালন করেছে, তা অনন্য উদাহরণ। মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত উচ্চতর শিক্ষা শেষে পুনরায় নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে এসে দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অবদান রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ করেছেন এই তরুণ বিজ্ঞানী। সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবসমাজের জন্য উচ্ছাসের এই পথচলা নিঃসন্দেহে স্বাবলম্বন, অধ্যবসায় ও মানবাধিকারের এক অনন্য প্রেরণা।
মতামত