হিন্দুস নিউজ

ভবানীগঞ্জের ফুটপাতে ২৩ বছর ধরে জুতা পালিশের ফাঁকে পত্রিকা পড়েন অনন্ত


| প্রিন্ট সংস্করণ

ভবানীগঞ্জের ফুটপাতে ২৩ বছর ধরে জুতা পালিশের ফাঁকে পত্রিকা পড়েন অনন্ত
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনালেখ্য বহু সময় সাধারণের চোখে পড়ে না। তবে রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলা সদরের ভবানীগঞ্জ বাজারে প্রতিদিন এক অনন্য দৃশ্যের অবতারণা ঘটে, যা মানুষের ভাবনায় গভীর নাড়া দেয়। পেশায় চর্মকার ৪১ বছর বয়সী অনন্ত চন্দ্র দাস দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে জুতা পালিশের কাজের ফাঁকে প্রতিদিনের সংবাদপত্র পড়ে আসছেন। ফুটপাতে বসে কিংবা জুতা সেলাই ও পলিশের কাজ সেরে হাতে একটি পত্রিকা নিয়ে গভীর মনোযোগে দেশ-বিদেশের খবর পড়েন তিনি। প্রান্তিক সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের এই অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞানের যে দীপশিখা প্রজ্বলিত রয়েছে, তা প্রমাণ করে যে সংবাদ ও অর্জিত জ্ঞানের পিপাসা কোনো বিশেষ পেশা বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করে না। শত দারিদ্র্য ও আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিয়ম করে পত্রিকা কিনে পড়ার এই অভ্যাসে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।


​অনন্ত চন্দ্র দাসের শৈশব ও শিক্ষাজীবন দারিদ্র্যের কষাঘাতে থেমে গিয়েছিল চতুর্থ শ্রেণিতেই। এরপর আর পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি, বাধ্য হয়েই তিনি বংশানুক্রমিক চর্মকারের পেশা বেছে নেন। তবে জানার আকাঙ্ক্ষা তাঁর হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। ২০০৩ সালের দিকে যখন বাগমারা অঞ্চলে চরমপন্থীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, তখন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সার্বিক ঘটনাবলী বিস্তারিত জানার আগ্রহ থেকেই তিনি প্রথম স্থানীয় ২ টাকা মূল্যের পত্রিকা কেনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে খবর পড়ার সেই প্রাথমিক কৌতুহল বদলে যায় গভীর নেশা ও অভ্যাসে। News copied from- 'হিন্দুস নিউজ'। বর্তমানে প্রতিদিন সকালে দোকানে গিয়ে কাজ শুরুর আগেই হকারের কাছ থেকে সংবাদপত্র সংগ্রহ করেন তিনি। কাজের চাপ কম থাকলে বা খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকার সময় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলোতে চোখ বুলিয়ে নেন এবং দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যার সময় সযত্নে সেই পত্রিকা ব্যাগে পুরে বাড়ি নিয়ে যান। নিজের সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে পাড়া- প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ যেন অনর্থক ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করতে পারে, সেই মানবিক আড়ষ্টতার কারণেই তিনি পত্রিকা সযত্নে ঢেকে বাড়ি নিয়ে যান বলে জানান।

​একজন নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ হয়েও অনন্ত দাস প্রতিদিন জুতা পালিশ করে ৩-৪ শত টাকা আয়ের সীমিত অর্থ থেকেই অত্যন্ত হিসেব করে প্রতি মাসের সংবাদপত্রের জন্য অন্তত ১০০ টাকা বরাদ্দ রাখেন। অনন্তর ভাষায়, খবরের কাগজ পড়া এখন তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ও নেশা হয়ে গেছে, একদিন পত্রিকা না পড়লে তাঁর মনের মধ্যে চরম শূন্যতা সৃষ্টি হয়। করোনা মহামারির কঠিন দিনগুলোতে যখন পত্রিকা সরবরাহ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সাময়িক বন্ধ ছিল, তখন তিনি মানসিকভাবে মারাত্মক কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, জ্ঞানার্জন ও সংবাদপত্র পাঠের জন্য উচ্চ শিক্ষার সনদ বা কোনো বিশেষ পেশাজীবী পরিচয়ের প্রয়োজন নেই, কেবল ইচ্ছাশক্তি ও প্রবল আগ্রহই যথেষ্ট। নিজের এই অভিনব অভ্যাসের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজেই খবর পড়েন না, বরং জুতা সেলাই ও পলিশ করাতে আসা গ্রাহকদের হাতেও পত্রিকা তুলে দেন। এর ফলে অপেক্ষারত গ্রাহকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটান এবং একই সাথে তাদের মধ্যেও পঠনপাঠনের সুযোগ তৈরি হয়, যা অনন্তর সামাজিক দায়িত্বশীলতারই এক বিশেষ বহিঃপ্রকাশ।

​অনন্ত চন্দ্র দাসের এই অকৃত্রিম জ্ঞানানুশীলন ও নিয়মিত পত্রিকা পাঠের বিষয়টিকে দীর্ঘকাল ধরে প্রত্যক্ষ করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও শিক্ষাবিদেরা। ভবানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক রেজাউনাল করিম অনন্তর এই সুদীর্ঘকালের অভ্যাসে মুগ্ধতা প্রকাশ করে জানান যে, একজন প্রান্তিক মানুষের সংবাদ পাঠের প্রতি এমন প্রগাঢ় ভালোবাসা সত্যিই বিরল ও অনুপ্রেরণাদায়ক। ভবানীগঞ্জ বাজারের পত্রিকা বিক্রেতা সঞ্জয় কুমার কুণ্ডু জানান, অনন্ত চন্দ্র দাস তাঁর সবচেয়ে অনুগত ও নিয়মিত ক্রেতাদের একজন; কখনো পত্রিকা পৌঁছাতে সামান্য দেরি হলেও অনন্ত নিজেই দোকানে এসে পত্রিকা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। মানবধিকার ও প্রান্তিক সনাতনী অধিকারের নিরিখে এই মেহনতী মানুষের অদম্য স্পৃহা সমাজের কাছে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও বাস্তবে তাঁর নিজের মাথা গোঁজার মতো স্থায়ী কোনো ভূমি বা ঘর নেই। অপরের জায়গায় একটি ছোট কুঁড়েঘর বানিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিনযাপন করছেন তিনি। গণিপুর ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় সদস্য আবদুস সোবহান মণ্ডল জানান, অনন্ত তাঁদের ওয়ার্ডের স্থায়ী ও শান্তিকামী অধিবাসী। সরকার ও উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিলে একজন ভূমিহীন ও উদীয়মান সচেতন মেহনতী নাগরিক হিসেবে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁর আবাসন সমস্যার টেকসই সমাধান হতে পারে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬


ভবানীগঞ্জের ফুটপাতে ২৩ বছর ধরে জুতা পালিশের ফাঁকে পত্রিকা পড়েন অনন্ত

প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image
সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনালেখ্য বহু সময় সাধারণের চোখে পড়ে না। তবে রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলা সদরের ভবানীগঞ্জ বাজারে প্রতিদিন এক অনন্য দৃশ্যের অবতারণা ঘটে, যা মানুষের ভাবনায় গভীর নাড়া দেয়। পেশায় চর্মকার ৪১ বছর বয়সী অনন্ত চন্দ্র দাস দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে জুতা পালিশের কাজের ফাঁকে প্রতিদিনের সংবাদপত্র পড়ে আসছেন। ফুটপাতে বসে কিংবা জুতা সেলাই ও পলিশের কাজ সেরে হাতে একটি পত্রিকা নিয়ে গভীর মনোযোগে দেশ-বিদেশের খবর পড়েন তিনি। প্রান্তিক সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের এই অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞানের যে দীপশিখা প্রজ্বলিত রয়েছে, তা প্রমাণ করে যে সংবাদ ও অর্জিত জ্ঞানের পিপাসা কোনো বিশেষ পেশা বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করে না। শত দারিদ্র্য ও আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিয়ম করে পত্রিকা কিনে পড়ার এই অভ্যাসে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।


​অনন্ত চন্দ্র দাসের শৈশব ও শিক্ষাজীবন দারিদ্র্যের কষাঘাতে থেমে গিয়েছিল চতুর্থ শ্রেণিতেই। এরপর আর পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি, বাধ্য হয়েই তিনি বংশানুক্রমিক চর্মকারের পেশা বেছে নেন। তবে জানার আকাঙ্ক্ষা তাঁর হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। ২০০৩ সালের দিকে যখন বাগমারা অঞ্চলে চরমপন্থীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, তখন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সার্বিক ঘটনাবলী বিস্তারিত জানার আগ্রহ থেকেই তিনি প্রথম স্থানীয় ২ টাকা মূল্যের পত্রিকা কেনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে খবর পড়ার সেই প্রাথমিক কৌতুহল বদলে যায় গভীর নেশা ও অভ্যাসে। News copied from- 'হিন্দুস নিউজ'। বর্তমানে প্রতিদিন সকালে দোকানে গিয়ে কাজ শুরুর আগেই হকারের কাছ থেকে সংবাদপত্র সংগ্রহ করেন তিনি। কাজের চাপ কম থাকলে বা খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকার সময় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলোতে চোখ বুলিয়ে নেন এবং দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যার সময় সযত্নে সেই পত্রিকা ব্যাগে পুরে বাড়ি নিয়ে যান। নিজের সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে পাড়া- প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ যেন অনর্থক ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করতে পারে, সেই মানবিক আড়ষ্টতার কারণেই তিনি পত্রিকা সযত্নে ঢেকে বাড়ি নিয়ে যান বলে জানান।

​একজন নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ হয়েও অনন্ত দাস প্রতিদিন জুতা পালিশ করে ৩-৪ শত টাকা আয়ের সীমিত অর্থ থেকেই অত্যন্ত হিসেব করে প্রতি মাসের সংবাদপত্রের জন্য অন্তত ১০০ টাকা বরাদ্দ রাখেন। অনন্তর ভাষায়, খবরের কাগজ পড়া এখন তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ও নেশা হয়ে গেছে, একদিন পত্রিকা না পড়লে তাঁর মনের মধ্যে চরম শূন্যতা সৃষ্টি হয়। করোনা মহামারির কঠিন দিনগুলোতে যখন পত্রিকা সরবরাহ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সাময়িক বন্ধ ছিল, তখন তিনি মানসিকভাবে মারাত্মক কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, জ্ঞানার্জন ও সংবাদপত্র পাঠের জন্য উচ্চ শিক্ষার সনদ বা কোনো বিশেষ পেশাজীবী পরিচয়ের প্রয়োজন নেই, কেবল ইচ্ছাশক্তি ও প্রবল আগ্রহই যথেষ্ট। নিজের এই অভিনব অভ্যাসের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজেই খবর পড়েন না, বরং জুতা সেলাই ও পলিশ করাতে আসা গ্রাহকদের হাতেও পত্রিকা তুলে দেন। এর ফলে অপেক্ষারত গ্রাহকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটান এবং একই সাথে তাদের মধ্যেও পঠনপাঠনের সুযোগ তৈরি হয়, যা অনন্তর সামাজিক দায়িত্বশীলতারই এক বিশেষ বহিঃপ্রকাশ।

​অনন্ত চন্দ্র দাসের এই অকৃত্রিম জ্ঞানানুশীলন ও নিয়মিত পত্রিকা পাঠের বিষয়টিকে দীর্ঘকাল ধরে প্রত্যক্ষ করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও শিক্ষাবিদেরা। ভবানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক রেজাউনাল করিম অনন্তর এই সুদীর্ঘকালের অভ্যাসে মুগ্ধতা প্রকাশ করে জানান যে, একজন প্রান্তিক মানুষের সংবাদ পাঠের প্রতি এমন প্রগাঢ় ভালোবাসা সত্যিই বিরল ও অনুপ্রেরণাদায়ক। ভবানীগঞ্জ বাজারের পত্রিকা বিক্রেতা সঞ্জয় কুমার কুণ্ডু জানান, অনন্ত চন্দ্র দাস তাঁর সবচেয়ে অনুগত ও নিয়মিত ক্রেতাদের একজন; কখনো পত্রিকা পৌঁছাতে সামান্য দেরি হলেও অনন্ত নিজেই দোকানে এসে পত্রিকা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। মানবধিকার ও প্রান্তিক সনাতনী অধিকারের নিরিখে এই মেহনতী মানুষের অদম্য স্পৃহা সমাজের কাছে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও বাস্তবে তাঁর নিজের মাথা গোঁজার মতো স্থায়ী কোনো ভূমি বা ঘর নেই। অপরের জায়গায় একটি ছোট কুঁড়েঘর বানিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিনযাপন করছেন তিনি। গণিপুর ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় সদস্য আবদুস সোবহান মণ্ডল জানান, অনন্ত তাঁদের ওয়ার্ডের স্থায়ী ও শান্তিকামী অধিবাসী। সরকার ও উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিলে একজন ভূমিহীন ও উদীয়মান সচেতন মেহনতী নাগরিক হিসেবে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁর আবাসন সমস্যার টেকসই সমাধান হতে পারে।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
ভবানীগঞ্জের ফুটপাতে ২৩ বছর ধরে জুতা পালিশের ফাঁকে পত্রিকা পড়েন অনন্ত
0:00 0:00
1.0x