দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। শরতের শুভ্র কাশফুল, শিউলির সুবাস, ঢাকের বাদ্য আর আগমনী গানের সুরে প্রকৃতি যখন সেজে ওঠে, তখন ভক্তদের হৃদয়ও ভরে ওঠে আনন্দ ও ভক্তিতে। দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে মণ্ডপে মণ্ডপে চলে পূজা, অঞ্জলি, আরতি, প্রসাদ বিতরণ ও নানা ধর্মীয় আয়োজন।
দুর্গাপূজাকে আমরা অনেক সময় শুধু উৎসব হিসেবেই দেখি। অথচ এই পূজার প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠান, উপাচার ও মন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নানা প্রতীকী অর্থ। তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাচার হলো ১০৮টি পদ্মফুল।
দেবী দুর্গার আরাধনায় ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের প্রথা বিশেষভাবে পরিচিত। বিশেষ করে সন্ধিপূজার সঙ্গে এই ১০৮ পদ্মের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ পূজায় দেবীকে বিভিন্ন উপাচারের পাশাপাশি পদ্ম নিবেদন করা হয়।
সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে পদ্মকে অত্যন্ত পবিত্র ফুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কাদামাটির মধ্যে জন্ম নিয়েও পদ্ম নির্মল ও সুন্দরভাবে প্রস্ফুটিত হয়। তাই পদ্মকে পবিত্রতা, সৌন্দর্য, জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
মায়ের চরণে পদ্ম নিবেদনের মধ্য দিয়ে ভক্ত যেন নিজের মনকেও নির্মল করার প্রার্থনা করেন—জীবনের অন্ধকার, অশুভ ও নেতিবাচকতা দূর করে সত্য, ন্যায় ও পবিত্রতার পথে চলার সংকল্প করেন।
সনাতন ধর্মে ১০৮ সংখ্যাটির বিশেষ আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় সাধনা, জপ ও উপাসনায় এই সংখ্যার ব্যবহার দেখা যায়। প্রচলিত জপমালায় ১০৮টি দানা থাকার বিষয়টিও এর একটি পরিচিত উদাহরণ।
তাই দেবীর আরাধনায় ১০৮টি পদ্ম নিবেদনকে ভক্তির পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। প্রতিটি পদ্ম যেন ভক্তের একেকটি প্রার্থনা, একেকটি সংকল্প এবং দেবীর প্রতি একেকটি নিবেদনের প্রতীক।
সনাতন ধর্মীয় ভাবনায় দেব-দেবীর উপাসনায় বিভিন্ন ফুলের আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তার মধ্যে পদ্ম বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। পদ্মকে অনেক সময় দেবত্ব ও পবিত্রতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
দুর্গাপূজায় পদ্ম নিবেদনের মাধ্যমে দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে এটি মানুষের অন্তরের সৌন্দর্য ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
একটি পদ্ম যেমন নোংরা জল ও কাদার মধ্যেও নিজের সৌন্দর্য ধরে রাখে, তেমনি সংসারের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও একজন মানুষ যেন নিজের নীতি, মানবিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ধরে রাখতে পারেন—পদ্মের প্রতীকী অর্থের মধ্যে এমন ভাবনাও খুঁজে পাওয়া যায়।
দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো সন্ধিপূজা। মহাষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং মহানবমীর প্রথম ২৪ মিনিট—মোট ৪৮ মিনিটের এই সন্ধিক্ষণকে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হয়।
এই সময় দেবীর বিশেষ আরাধনা করা হয়। বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ১০৮টি পদ্ম, প্রদীপ ও অন্যান্য উপাচার দিয়ে দেবীর পূজা সম্পন্ন করা হয়।
তবে অঞ্চল, মন্দির ও পারিবারিক রীতিভেদে পূজার উপাচারে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তাই ১০৮ পদ্মের প্রথাকে সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি প্রচলিত রীতি হিসেবে দেখা উচিত।
১০৮ পদ্মের সঙ্গে দেবীর আরাধনা নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। কথিত আছে, শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার আরাধনা করতে ১০৮টি নীলপদ্ম নিবেদনের সংকল্প করেছিলেন। পূজার সময় একটি পদ্ম কম পাওয়া গেলে তিনি নিজের চোখকে পদ্মের সঙ্গে তুলনা করে তা উৎসর্গ করার সংকল্প করেন।
ভক্তির এই গভীরতা ও আত্মনিবেদনের কাহিনি থেকেই দেবীর আরাধনায় পূর্ণ ভক্তি ও আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে ১০৮ পদ্মের মাহাত্ম্য আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে এই কাহিনির বিভিন্ন সংস্করণ ও আঞ্চলিক বর্ণনা রয়েছে; এটি মূলত প্রচলিত ধর্মীয় আখ্যান হিসেবে পরিচিত।
আজ দুর্গাপূজা শুধু পূজার মণ্ডপে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে সামাজিক মিলন, সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও আনন্দের বৃহৎ উৎসবে। নতুন পোশাক, মণ্ডপসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিমা দর্শন—সব মিলিয়ে দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে বাঙালির জীবনের অন্যতম আনন্দঘন সময়।
কিন্তু এই আনন্দের পাশাপাশি পূজার আচারগুলোর পেছনের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রতীকী তাৎপর্য জানা প্রয়োজন। কারণ ঐতিহ্যকে শুধু পালন করলেই হয় না, তার অর্থ ও মূল্যবোধও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হয়।
১০৮টি পদ্ম তাই কেবল ১০৮টি ফুল নয়। ভক্তির দৃষ্টিতে এটি হতে পারে শ্রদ্ধা, পবিত্রতা, আত্মনিবেদন ও মায়ের চরণে অর্পিত অসংখ্য প্রার্থনার প্রতীক।
শারদীয় দুর্গোৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অশুভের বিরুদ্ধে শুভর জয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্ধকারের মাঝে আলোর সন্ধানই এই উৎসবের অন্যতম অন্তর্নিহিত বার্তা।
মায়ের চরণে ১০৮ পদ্মের অর্ঘ্য যেন আমাদের অন্তরকেও পবিত্র করে তোলে—এই হোক শারদীয় প্রার্থনা।
মতামত