উৎসব শুরু হতে তখনো দুই দিন বাকি। কিন্তু শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ আশ্রমের সামনের রাস্তা দেখে তা বোঝার উপায় নেই।
প্রধান ফটক দিয়ে আশ্রমে ঢুকতে যাব, এমন সময় ‘কোথায় যাবেন?’ বলে পথ আগলে দাঁড়ালেন একজন। পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি।
তিনি আবার বললেন, ‘বাবা, কোথায় যাবেন?’
উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লাম—‘আপনি কে? পথ আগলে দাঁড়াচ্ছেন কেন?’ হাসি ফুটল তাঁর মুখে। বললেন, ‘বাবা, আমি তো গেটম্যান। দুই দিন পরে ঠাকুরের উৎসব (১৩৯তম আবির্ভাব দিবস)।
‘আপনি আশ্রমের গেটম্যান?’
‘হ্যাঁ’।
অশীতিপর এই ব্যক্তি মো. আল্লেক আলী শেখ। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আশ্রমের সেবায় নিয়োজিত তিনি। করোনার সময় থেকে প্রধান ফটক পাহারা দিচ্ছেন। কাজটি করছেন সানন্দে।
পাবনার হিমাইতপুর সৎসঙ্গ আশ্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ আল্লেক। সবার কাছে আল্লেক চাচা নামে পরিচিত। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তিনি।
শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ছিলেন সনাতন ধর্মের একজন আধ্যাত্মিক পুরুষ। ১২৯৫ বঙ্গাব্দের ৩০ ভাদ্র পাবনা শহরের অদূরে হিমাইতপুরে তিনি আবির্ভূত হন। পরে সেখানেই গড়ে ওঠে সৎসঙ্গ আশ্রম। সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী প্রচারের কারণে দেশে-বিদেশে নানা ধর্মের অসংখ্য ভক্ত-অনুসারী হয় তাঁর। এখন বছরে দুটি মহোৎসব হয় আশ্রমে। লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম ঘটে সেখানে।
অনেক কাজের কাজি : হিমাইতপুরের পশ্চিম পাড়ার তৈয়জ্জদ্দিন শেখের ছেলে আল্লেক শেখ। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাবা ছিলেন কৃষক। তৃতীয় শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। জীবিকার টানে বাবার সঙ্গে নামতে হয় ফসলের মাঠে। হালচাষ করতেন। একসময় গরুর গাড়িও চালিয়েছেন। পরে হিমাইতপুর ও আশপাশের গ্রাম থেকে গরুর গাড়িতে ইট টেনেছেন। পাবনা শহর থেকে সিমেন্টসহ ভারী মালপত্রও আনা-নেওয়া করতেন। একসময় চাকায় লোহার রিং লাগানো গরুর গাড়ি নিষিদ্ধ হয়। ফলে শহরের পিচঢালা পথে চালাতে পারতেন না আল্লেক। পরে কাজ নিলেন রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে। কিছু টাকা জমিয়ে এক পর্যায়ে পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে গরু বিক্রির ব্যবসা শুরু করলেন।
নিভে গেল এক চোখের আলো : রাজশাহী থেকে গরু নিয়ে ফেরার সময় একবার ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। তাঁর কপালের হাড় ভেঙে ডান চোখের ভেতরে ঢুকে যায়। টানা ৯ দিন অচেতন ছিলেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হলেন। কিন্তু চিরতরে নিভে গেল ডান চোখের আলো। সেই থেকে এক চোখে দুনিয়া দেখছেন আল্লেক।
আশ্রমে আশ্রয় : এরপর যেন ‘বোঝা’ হয়ে গেলেন আল্লেক। শরীরে সামর্থ্য থাকলেও লোকে তাঁকে কাজে নিল না। শেষমেশ আল্লেকের ঠাঁই হয় এই আশ্রমে। দৈনিক মজুরি মাত্র তিন টাকা। সেটা ১৯৭৪-৭৫ সালের কথা। তখন আশ্রমের অবকাঠামো ছিল অত্যন্ত সাধারণ।
তবে আল্লেক কাজ করতে লাগলেন মন দিয়ে। তাঁর শারীরিক সক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘যে আলুর বস্তা সরাতে দুই-তিনজনের দরকার হতো, আল্লেক চাচা একাই বিশাল ভার পিঠে তুলে মন্দির চত্বর থেকে গোডাউনে নিয়ে যেতেন।’ মন্দিরে কঠোর শ্রমের পাশাপাশি তিনি আশ্রমের বিস্তীর্ণ জমিতে হালচাষ করেছেন। নিজ হাতে মেহগনির বাগান গড়ে তুলেছেন, যা আজ বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
বাকিতে এক লাখ ইট : আশ্রমের প্রতি আল্লেকের অবদান কেবল শ্রমেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর ত্যাগ ও বিশ্বস্ততা প্রতিষ্ঠানের ভিত মজবুত করেছে। একসময় প্রার্থনা মন্দিরের ভবন নির্মাণ শুরু হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে অর্থসংকটে থমকে যায় নির্মাণকাজ। মন্দিরের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের অনুরোধে আল্লেক তাঁর ভাইদের ইটভাটা থেকে মোট এক লাখ ইট বাকিতে এনে দিয়েছিলেন। উৎসবের কিছুদিন আগে এই বিপুল পরিমাণ ইটের জোগান মন্দির নির্মাণ সম্পন্ন করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আশ্রমের বর্তমান সীমানার ভেতরে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এক বিঘা জমি ছিল আল্লেকের। কোনো প্রকার আর্থিক দাবি ছাড়াই জমিটি আশ্রমের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন আল্লেক। যদিও পরবর্তী সময়ে আশ্রম কর্তৃপক্ষ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে সেই জমির সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করেছিল। আল্লেক এভাবে আশ্রমের সঙ্গে জড়িয়েছেন নিজের প্রায় পুরোটা জীবন। আশ্রম কর্তৃপক্ষও প্রতিদান দিতে ভোলেনি। সব সময় আল্লেকের পাশে থেকেছে তারা। কয়েক বছর আগে আশ্রম কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আল্লেকের বাঁ চোখের অপারেশন হয়। তিনি ফিরে পান পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি।
কাজ করেন, নামাজও আদায় করেন : অভাবের দিনে আশ্রম কর্তৃপক্ষ যেভাবে তাঁর পাশে থেকেছে, তা কখনো ভোলার নয় বলে মনে করেন আল্লেক শেখ। আশ্রমবাসী তাঁকে ভালোবাসে, সম্মান করে। তাই তাদের মায়া কাটাতে পারেন না। মুসলিম হয়েও হিন্দুদের মন্দির পাহারা দেন বলে অনেকে কটুকথা শুনিয়েছে। আল্লেক বলেন, ‘ঢের কইছে লোকে। কিন্তু মানুষের সেবার ক্ষেত্রে ধর্ম কোনো বাধা নয়। আশ্রমের মানুষ আমাকে যে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছে—তা ভুলি কী করে? সবাই আমাকে খুব শ্রদ্ধা করে। আমিও চেষ্টা করি ভালো সেবা দিতে।’
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, আল্লেক শেখের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১ জানুয়ারি। সে হিসাবে বয়স এখন ৮০ বছর। এই বয়সেও তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা ও ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে মানুষকে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় আসেন আশ্রমে। বাসায় ফেরেন সন্ধ্যায়। পান, চা, বিড়ি বা তামাক—কিছুই সেবন করেন না। ধর্মীয় বিধান পালনেও তিনি কঠোর। ডিউটি চলাকালে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। তাঁর ভাষায়, ‘নামাজের সময় নামাজ, কাজের সময় কাজ। আশ্রমের সবাই বরং নামাজ অদায়ে উৎসাহ দেয়।’
করোনার সময় থেকে আশ্রমের প্রধান গেটরক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় আল্লেককে। মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় তিনি তরুণ-তরুণীদের অহেতুক আড্ডা ও মোটরসাইকেল প্রবেশে বাধা দেন।
বিশ্বস্ত ব্যক্তি : শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্মভিটা ও আশ্রমের পবিত্র স্থানের একটি অংশ বর্তমানে পাবনা মানসিক হাসপাতালের সীমানার ভেতরে পড়েছে। ঠাকুরের জন্মভিটায় প্রতিবছর তুলসীগাছ রোপণ করেন আল্লেক। বার্ষিক উৎসবের সময় সেখানে দানবাক্স স্থাপন করা হয়। অত্যন্ত বিশ্বস্ত বলে সেটা দেখভালের দায়িত্বও পড়ে আল্লেকের ঘাড়ে। পরম যত্নে সেই সম্পদ রক্ষা করেন তিনি।
রক্ষণভাগের খেলোয়াড় : আশ্রম কর্তৃপক্ষের কাছে আল্লেক শেখ কেবল একজন কর্মচারী নন, বরং পিতৃপ্রতিম অভিভাবক। যেমনটি বলছিলেন পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমের সহঋত্বিক পুরোধা কল্যাণ কুমার বিশ্বাস, “আল্লেক চাচা আমাদের আশ্রমের একজন ‘রক্ষণভাগের খেলোয়াড়’। আশ্রমের দীর্ঘ ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী তিনি। ঠাকুরের জন্মভূমির প্রতি তাঁর যে মমতা, তা সত্যিই অতুলনীয়।”
সাংস্কৃতিক সম্পাদক বাউল রথীন মিত্রের মতে, “অনুকূল ঠাকুরের ‘মানুষ আপন টাকা পর/যত পারিস মানুষ ধর’ বাণীর এক মূর্ত প্রতীক আল্লেক চাচা। তিনি আমাদের পিতৃতুল্য। তাঁকে কেবল একজন গেটম্যান বললে ভুল হবে; তিনি আমাদের পরমাত্মীয়।”
আশ্রমের নির্বাহী কমিটির সদস্য মুকুল বর্ধন বলেন, ‘আশ্রমের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, উনি সার্বক্ষণিক সেদিকে খেয়াল রাখেন।’
আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক তাপস চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘তিনি যত দিন কাজ করতে পারবেন, করবেন। অবসরের পর তাঁর জন্য আমরা একটা সম্মানিরও ব্যবস্থা করব, যাতে বাকি জীবন ভালোভাবে চলতে পারেন।’
খাদ্য ভাতাসহ এখন আট হাজার টাকা বেতন পান আল্লেক শেখ। এই বেতনে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তিনি বলেন, ‘বেতনটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলে চলতে সুবিধা হতো।’
আশ্রম থেকে যখন ফিরছিলাম, তখনো গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন আল্লেক শেখ। বললেন, ‘বাবা, দোয়া করবেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যাতে এই পবিত্র ভূমির সেবা করতে পারি।’ যে সংকল্প আল্লেক শেখের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, এটিই যেন আবহমান বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত।
মতামত