ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে আজ শুরু হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। মহাষষ্ঠীর পরম পবিত্র তিথিতে দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুভ সূচনা ঘটেছে এই মহোৎসবের। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়ের বার্তা নিয়ে দেবীর এই মর্ত্যে আগমন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দেশের সনাতনী সম্প্রদায় গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, রাবণবধের উদ্দেশ্যে ভগবান রামচন্দ্র শরৎকালে অকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন, যাকে অকালবোধন বলা হয়। শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা মতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটছে ঘোড়ায় চড়ে, যার ফল ছত্রভঙ্গ বা সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর দেবী স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন নৌকায় চড়ে, যার ফল শস্যবৃদ্ধি। তিথির বিশেষ গণনার কারণে এবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে টানা ছয় দিনব্যাপী। শনিবার ও রবিবার দুদিন ধরে মহাসপ্তমীর পূজা সম্পন্ন হবে, এরপর সোমবার মহাঅষ্টমী, মঙ্গলবার মহানবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের যবনিকাপাত ঘটবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের সমাগম ও প্রস্তুতি শেষ মুহূর্তে পৌঁছেছে।
তবে আনন্দের এই মহাসমারোহের নেপথ্যে রয়ে গেছে এক বিষাদময় ও আতঙ্কের চিত্র। উৎসবের ঠিক পূর্ব মুহূর্তেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দির ও প্রতিমায় হামলা এবং হিংসাত্মক অপরাধের থাবা থামেনি। রাজধানীর ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দ সনাতনীদের ওপর চলা এই আঘাতের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে তুলে ধরেছেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, পূজার প্রাক্কালে দেশের অন্তত ৩৪টি স্থানে মন্দির, প্রতিমা ভাঙচুর ও সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর এবং সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও উপাসনালয়ে হামলা, চুরি ও লুটপাটের পাশাপাশি নওগাঁয় ডাকাতির ভয়াবহ খবর পাওয়া গেছে। যদিও এসব ঘটনায় ১১টি মামলা দায়ের ও কিছুসংখ্যক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মৌলিক মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় তা যথেষ্ট নয় বলেই মনে করছেন সনাতনী নেতৃবৃন্দ। তাঁরা জোর দাবি জানিয়েছেন, শুধু পূজা চলাকালীন নিরাপত্তা নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের ভয়হীনভাবে নিজস্ব ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিবন্ধকতা ও শঙ্কার মধ্যেও সম্প্রীতি ও অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে সনাতনী সমাজ ঐতিহ্য ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। এবার সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি। রাজধানী ঢাকায় ২৫৮টি মণ্ডপে উদযাপিত হচ্ছে এই উৎসব। স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসব উদযাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূজা উদযাপন পরিষদ ২২ দফা নির্দেশনা জারি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রতিটি মণ্ডপে সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবী পাহারা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সার্বিক যোগাযোগ। বাজারগুলোতে কেনাকাটার ভিড় এবং দীর্ঘ ছুটির কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে উৎসবের আমেজ থাকলেও সনাতনীদের মূল দাবি—সকল প্রকার বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি জাতি ও ধর্মের মানুষের মানবাধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
মতামত