মাঘ মাসের শুরুতেই ঝিনাইদহ জেলার হাট-বাজারগুলোতে খেজুর গুড়ের বিক্রি বেড়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার খেজুর গুড়ের মান ভালো হওয়ায় গাছি ও কৃষকরা উভয়েই লাভবান হচ্ছেন। প্রতি সপ্তাহের দুই দিন হাট বসা সাফদারপুর বাজার এই অঞ্চলের খেজুর গুড়ের কেন্দ্রীয় হাটে পরিণত হয়েছে।
সাফদারপুর হাটে বেলা ১১টা থেকে গাছি ও কৃষকরা বাড়িতে তৈরি খেজুর গুড় নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান ও আলমসাধু (ইঞ্জিনচালিত) গাড়ি ব্যবহার করে দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও কৃষকরা হাটে পৌঁছান। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন এই হাটে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার খেজুর গুড় বেচাকেনা হয়।
হাটে ঝোলা গুড়, দানা গুড়, জিড়েন রসের গুড়, পাটালি সহ বিভিন্ন ধরনের খেজুর গুড় পাওয়া যায়। জেলার পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়াও ঢাকার মতো বড় শহরের পাইকারি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত হাটে আসেন। একজন গাছি আশরাফুল ইসলাম জানান, “আগেও ব্যবসায়ীরা ট্রেনে করে এই হাট থেকে গুড় কিনে যেতেন। এখনও খুলনা, যশোর, নাটোর, পাবনা ও ঢাকার ব্যবসায়ীরা আসে, এজন্য আমরা ভালো দাম পাই।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঝিনাইদহ জেলায় বর্তমানে ৬টি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ২৩৫টি খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬০টি গাছ রস আহরণযোগ্য। চলতি মৌসুমে জেলার ৬টি উপজেলা থেকে প্রায় ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ২৪১ লিটার খেজুর রস ও প্রায় ৮৭২ মেট্রিক টন খেজুর গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদিত গুড়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় চাহিদা মেটিয়ে দেশের বিভিন্ন শহরে সরবরাহ করা হয়।
দোড়া গ্রামের নাজমুল হোসেন জানান, “এক ভাঁড় ১০-১২ কেজি ওজনের গুড় হাটে ১৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। দাম নির্ভর করে গুড়ের মানের ওপর।” ক্রেতা তসলিম খাতুন বলেন, “আমার আত্মীয়-স্বজন বিভিন্ন শহরে থাকেন। শীত এলেই তাদের জন্য গুড় কিনে পাঠাতে হয়। তাই সরাসরি হাটে আসি।”
পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদার উজ্জ্বল কুমার সাহা জানান, “গ্রামের সাধারণ গাছি ও কৃষকরা হাটে আসেন। ভেজাল গুড় খুব একটা আসে না, তাই আমরা নিয়মিত ভালো মানের গুড় পাই এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠাই। এবারের উৎপাদন বেশি ও দামও ভালো।”
সাফদারপুর হাটের ইজারাদার আবুল কাশেম বাবু বলেন, “খেজুর গাছ কমছে, গাছিও কমছে। সরকার যদি খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ নেয়, তাহলে গাছিরা বাঁচবে। শীতকালে কৃষকরা গুড় বিক্রি করে ভালো আয় করেন। সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন আরও বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখবে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “ঝিনাইদহ জেলায় সবচেয়ে বেশি খেজুর গাছ কোটচাঁদপুর উপজেলায়। যে কারণে সাফদারপুরে খেজুর গুড়ের হাট গড়ে উঠেছে। খেজুর গাছ রোপণ ও গাছিদের পৃষ্ঠপোষকতা করলে গুড়ের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।”
মতামত