রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বরেন্দ্র অববাহিকা ও সীমান্ত অঞ্চলের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হওয়া হাজার বছরের প্রাচীন সনাতন ধর্মাবলম্বী ও অপরাপর সংস্কৃতির অমূল্য প্রত্নসম্পদ অবশেষে ঠাঁই পেল জাতীয় জাদুঘরের সুরক্ষিত হেফাজতে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (১ বিজিবি, রাজশাহী ব্যাটালিয়ন)-এর দীর্ঘ প্রশাসনিক তৎপরতায় উদ্ধারকৃত একটি অতি দুর্লভ রেবন্ত মূর্তি, জৈন তীর্থংকর, অপরাজিতা, মহাকালী চামুণ্ডা, নটরাজ শিব ও বেশ কয়েকটি বিষ্ণুমূর্তিসহ মোট ২৬টি প্রাচীন ভাস্কর্য এবং ১ হাজার ৮১৮টি প্রাচীন ধাতব মুদ্রা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগে।
উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দিক থেকে সবচেয়ে বড় চমক বেলে পাথরের তৈরি সূর্যপুত্র 'রেবন্ত'-এর মূর্তিটি। প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, ভাস্কর্যটি সপ্তম শতকের—যা এ অঞ্চলের প্রাচীন সনাতনী ভাস্কর্যশৈলী ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক বিরল দলিল। হিন্দু শাস্ত্র ও পৌরাণিক বর্ণনা মতে, রৈবত বা রেবন্ত হলেন সৌরদেবতা সূর্য ও তাঁর পত্নী সংজ্ঞার কনিষ্ঠ সন্তান। প্রাচীন বাংলা ও বিহারের মধ্যযুগীয় ধারায় ঘোড়ায় চড়া শিকারির বেশে তাঁর পূজার বিশেষ প্রচলন ছিল। সম্প্রতি হস্তান্তরিত এই সংগ্রহের তথ্য পর্যালোচনায় প্রত্ন-গবেষকরা জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলের সনাতন ধর্মীয় ভাবধারা ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের শিকড় কতটা গভীরে বিস্তৃত ছিল, তা এই ভাস্কর্যগুলোর মাধ্যমে আবারও দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')
উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে নবম-দশম শতকের জৈন তীর্থংকর, একাদশ-দ্বাদশ শতকের অপরাজিতা দেবী, বিক্রমশালী চামুণ্ডা, তাণ্ডবরূপী নটরাজ শিব, অক্ষত শিবলিঙ্গ এবং বেশ কিছু প্রাচীন কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি রয়েছে। গোদাগাড়ী, বাঘা, চারঘাট ও কাটাখালীর মতো সীমান্তবর্তী নদীঘেঁষা এলাকা থেকে বিভিন্ন সময় বিজিবির হাতে আটক হওয়া এসব নিদর্শন পাচারকারীদের হাত থেকে বেঁচে যায়। পরবর্তীতে ব্যাটালিয়নে উপযুক্ত সংরক্ষণাগার না থাকায় এবং জাতীয় সম্পদ বিনষ্টের ঝুঁকিতে পড়ায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত টানা ৯টি দাপ্তরিক চিঠি আদান-প্রদানের পর চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল পাঠায় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
বিজিবি ও জাতীয় জাদুঘরের এই যৌথ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে ঐতিহ্যপ্রেমীরা বলছেন, বাংলার প্রাচীন সনাতনী ও ধার্মিক ঐতিহ্যের এসব প্রত্নবস্তু রক্ষা করা শুধু ইতিহাস রক্ষা নয়, বরং এ দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও মানবাধিকারের ভিত্তিকে সমৃদ্ধ করা। জাতীয় জাদুঘরের সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা শেষ হলেই বিশেষ প্রদর্শনী ও গবেষণার জন্য এসব অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মতামত