১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে যৌথ বাহিনীর অবদান ইতিহাস ও মানবিকতার এক অনন্য দলিল। ৪৭-এর দেশভাগের বিভীষিকা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ক্ষত বুকে নিয়ে বেড়ে ওঠা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আনন্দ স্বরূপ ছিলেন সেই বীর সেনানীদের একজন, যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ডেরা ইসমাইল খানে জন্মগ্রহণকারী এবং ভারতের সর্বকনিষ্ঠ সামরিক ক্যাডেটদের অন্যতম আনন্দ স্বরূপ পরবর্তীতে ৮ গোর্খা রাইফেলসে কমিশন লাভ করেন। ৭১-এর রণক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম অত্যাচার ও গণহত্যার মুখে যখন লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের জীবন বিপন্ন, তখন যৌথ বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদানে ডাক পড়ে এই জাঁদরেল কমান্ডারের।
বাংলাদেশ সীমান্ত ও পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনে গঠিত ‘কিলো ফোর্স’ বিগ্রেডের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার আনন্দ স্বরূপ। আগরতলায় পৌঁছানোর পর ১৭ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ভারতীয় সেনা ও অদম্য যৌথ মুক্তিবাহিনীকে একসঙ্গে সুসংগঠিত করেন। তাঁর অধীনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪র্থ ও ১০ম ব্যাটালিয়ন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশিষ্ট ব্যাটালিয়নগুলো এক হয়ে কাজ শুরু করে। যৌথ বাহিনীর প্রায় পাঁচ হাজার সেনাসদস্যকে একটি সুদৃঢ় ও শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করে তিনি একের পর এক সফল অভিযান চালান। ৩ ও ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বেলোনিয়া বুলজ ভেদ করে যৌথ বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে ফেনী ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে এবং ৫ ডিসেম্বর স্বাধীন হয় ঐতিহ্যবাহী ফেনী শহর।
ফেনী মুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার কৌশলগত রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা পাকিস্তানি বাহিনীর ৯৭ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও ৯১ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে ফেলে। পরবর্তী সময়ে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং ১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হয়ে কিলো ফোর্স একে একে নাজিরহাট, কুমিরা এবং ভাটিয়ারি শত্রুমুক্ত করে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত ঘাঁটিগুলো আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ১৭ ডিসেম্বর উল্লাসে ফেটে পড়া মুক্তিকামী চট্টগ্রামের বুকে বিজয়ী বীরের মতো প্রবেশ করেন ব্রিগেডিয়ার আনন্দ স্বরূপ। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে ‘মহাবীর চক্র’ এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ সামরিক সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘পরম বিশিষ্ট সেবা পদক’ (পিভিএসএম)-এ ভূষিত করা হয়। মানবাধিকার রক্ষা এবং একটি মুক্ত ও বৈষম্যহীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠায় তাঁর এ অবদান ইতিহাসের পাতায় সর্বদা উজ্জ্বল থাকবে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')
মতামত