বৈদিক সাহিত্যে যেসব ঋষি মন্ত্র বা সূক্ত ‘প্রত্যক্ষ’ করেছিলেন, তাদের বলা হতো ‘মন্ত্রদ্রষ্টা’। ঋগ্বেদে অন্তত ২৭ জন নারী ঋষির উল্লেখ পাওয়া যায়, যারা সরাসরি মন্ত্র রচনা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— ঘোষা, অপালা, বিশ্ববারা, লোপামুদ্রা ও বাচক্লবী গার্গী।
শাস্ত্র অনুযায়ী, যারা সারাজীবন ব্রহ্মচর্চা ও বেদ অধ্যয়নে নিয়োজিত থাকতেন, তাদের বলা হতো ‘ব্রহ্মবাদিনী’। এই ব্রহ্মবাদিনীরা পুরুষ ঋষিদের মতোই যজ্ঞ পরিচালনা, বেদ পাঠ এবং ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কে অংশ নিতেন। প্রাচীন ধর্মীয় আচার অনুযায়ী, বৈদিক যজ্ঞে স্ত্রীর উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। স্ত্রীকে ‘অর্ধাঙ্গিনী’ হিসেবে গণ্য করা হতো এবং বিশ্বাস করা হতো—তাঁকে ছাড়া যজ্ঞ সম্পূর্ণ হয় না।
ঋগ্বেদের বিভিন্ন সূক্তে নারীর পৌরোহিত্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন, ঋগ্বেদ ৫.২৮ সূক্তে দেখা যায়— বিশ্ববারা আত্রেয়ী নিজেই যজ্ঞ পরিচালনা করছেন এবং অগ্নিদেবতার স্তুতি করছেন। একই সঙ্গে ‘পত্নীবৎ যজ্ঞ’-এ স্ত্রীর ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাও শাস্ত্রসম্মতভাবে স্বীকৃত।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, প্রাচীনকালে নারীদেরও পুরুষদের মতো উপনয়ন বা পৈতা সংস্কার হতো। হারীত ধর্মসূত্রে নারীদের দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে— ‘ব্রহ্মবাদিনী’ ও ‘সদ্যোবধূ’। ব্রহ্মবাদিনীদের উপনয়ন হতো, তারা অগ্নিহোত্র পালন করতেন এবং নিয়মিত বেদ অধ্যয়ন করতেন।
নারীদের শাস্ত্রীয় জ্ঞানের উৎকর্ষতার অন্যতম উদাহরণ পাওয়া যায় বৃহদারণ্যক উপনিষদে। সেখানে গার্গী যেভাবে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যকে আধ্যাত্মিক বিতর্কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তা নারীদের উচ্চস্তরের দার্শনিক সক্ষমতার স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
তবে গবেষকদের মতে, পরবর্তী বৈদিক যুগে এবং বিশেষ করে স্মৃতিশাস্ত্রসমূহ—যেমন মনুস্মৃতি—প্রভাবিত হওয়ার পর নারীদের বৈদিক অধিকার ধীরে ধীরে সীমিত হতে থাকে। এই সময় থেকেই নারীদের জন্য উপনয়ন বন্ধ হয়ে যায় এবং পৌরোহিত্য ক্রমশ পুরুষদের একচেটিয়া অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, “বেদে কোথাও বলা হয়নি যে নারী পুরোহিত হতে পারবেন না।” বরং ঋগ্বেদের ১০.৮৫ সূক্ত (বিবাহ সূক্ত) আজকাল বিভিন্ন স্থানে নারী পুরোহিতদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে, যা বৈদিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাস ও শাস্ত্রভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—নারীর ধর্মীয় অধিকার কি আদৌ নতুন কিছু, নাকি তা হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন বৈদিক সত্যের পুনরুদ্ধার মাত্র?
মতামত