বিঘ্নহর্তা ও সিদ্ধিদাতা শ্রীগণেশের আরাধনায় মণ্ডপে মণ্ডপে নানা আয়োজন
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব গণেশ চতুর্থী। ভগবান শ্রীগণেশের আবির্ভাব বা জন্মতিথি স্মরণে এই উৎসব পালিত হয়। বিনায়ক চতুর্থী ও বিনায়ক চবিথি নামেও পরিচিত এই তিথি ভক্তদের কাছে জ্ঞান, বুদ্ধি, সিদ্ধি, শুভ সূচনা ও বিঘ্ননাশের বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে গণেশ চতুর্থী পালিত হয়। এদিন ভক্তরা ভোরে স্নান করে শুদ্ধাচার পালন, সংকল্প গ্রহণ এবং বিধি-বিধান অনুযায়ী শ্রীগণেশের পূজা-অর্চনা করেন। বাড়ি, মন্দির ও বিভিন্ন সর্বজনীন মণ্ডপে গণেশের প্রতিমা স্থাপন করে ফুল, দূর্বা, ফল, মিষ্টান্ন ও মোদক নিবেদন করা হয়। অনুষ্ঠিত হয় মঙ্গলাচরণ, স্তোত্রপাঠ, আরতি, প্রসাদ বিতরণসহ নানা ধর্মীয় আয়োজন।
সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে ভগবান গণেশকে গণপতি, বিনায়ক, গজানন, একদন্ত, লম্বোদর ও সিদ্ধিদাতাসহ বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। তিনি দেবাদিদেব মহাদেব শিব ও দেবী পার্বতীর পুত্র হিসেবে পূজিত।
শ্রীগণেশের মূর্তির প্রতিটি অঙ্গের মধ্যেও রয়েছে গভীর প্রতীকী শিক্ষা। তাঁর বৃহৎ মস্তক জ্ঞান ও বৃহৎ চিন্তার প্রতীক, বড় কান মনোযোগ দিয়ে শোনার শিক্ষা দেয়, ছোট চোখ গভীর মনোযোগ ও একাগ্রতার প্রতীক। হাতির মতো শুঁড় বিচক্ষণতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তাঁর বাহন ইঁদুর মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক—যাকে নিয়ন্ত্রণ করে জ্ঞান ও বিবেকের পথে চলার শিক্ষা দেওয়া হয়।
সনাতন ধর্মীয় আচারে যেকোনো শুভ কাজের সূচনায় শ্রীগণেশের পূজা করার প্রচলন রয়েছে। তাঁকে বিঘ্নহর্তা অর্থাৎ বাধা দূরকারী এবং সিদ্ধিদাতা অর্থাৎ সাফল্য ও সিদ্ধি প্রদানকারী হিসেবে ভক্তরা আরাধনা করেন।
বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, ব্যবসা শুরু, শিক্ষা গ্রহণ কিংবা অন্যান্য মঙ্গলজনক কাজের আগে গণেশের পূজা করার রীতি প্রচলিত। এর মাধ্যমে শুভ কাজটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার জন্য ভগবানের আশীর্বাদ কামনা করা হয়।
গণেশ চতুর্থীর অন্যতম প্রধান তাৎপর্য হলো—জ্ঞান ও বিবেকের মাধ্যমে জীবনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমের শিক্ষা। ভক্তরা এই দিনে শুধু বাহ্যিক পূজা-অর্চনাই করেন না, নিজেদের অন্তরের অজ্ঞানতা, অহংকার, লোভ, হিংসা ও নেতিবাচক চিন্তা দূর করার সংকল্পও গ্রহণ করেন।
গণেশকে বিদ্যা ও বুদ্ধির অধিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাই শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করেন।
গণেশ পূজায় দূর্বা ঘাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। পূজার নৈবেদ্যে দূর্বা নিবেদনের প্রচলন রয়েছে। একইভাবে মোদক গণেশের অন্যতম প্রিয় নৈবেদ্য হিসেবে পরিচিত। মোদকের মিষ্টতা মানুষের জীবনে জ্ঞান, সাধনা ও শুভকর্মের মাধ্যমে অর্জিত আনন্দ ও পরিতৃপ্তির প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়।
গণেশ চতুর্থীর দিনে ভক্তরা ব্যক্তিগত কল্যাণের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেন। জীবনের সব বাধা-বিপত্তি দূর করে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ পথে চলার শক্তি, জ্ঞান ও বিবেক প্রদানের জন্য শ্রীগণেশের আশীর্বাদ কামনা করা হয়।
অনেক ভক্ত এই দিনে উপবাস পালন করেন এবং পূজা শেষে প্রসাদ গ্রহণ করেন। মণ্ডপে মণ্ডপে ধর্মীয় আলোচনা, ভজন-কীর্তন, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজনও করা হয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহের সঙ্গে গণেশ চতুর্থী পালন করেন। স্থানীয় ঐতিহ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী কোথাও বাড়িতে, আবার কোথাও মন্দির ও সর্বজনীন মণ্ডপে গণেশ প্রতিমা স্থাপন করে পূজার আয়োজন করা হয়।
পূজাকে কেন্দ্র করে সনাতন সম্প্রদায়ের নারী, পুরুষ, শিশু ও তরুণদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যায়। বিভিন্ন স্থানে পূজা-অর্চনার পাশাপাশি প্রসাদ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গণেশ চতুর্থী ধর্মীয় উৎসব হলেও এর সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষ একত্রিত হয়, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। ভক্তরা ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির চর্চার মাধ্যমে সমাজে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
গণেশ চতুর্থীর মূল শিক্ষা যেন শুধু মণ্ডপের পূজায় সীমাবদ্ধ না থাকে—জ্ঞান, বিবেক, বিনয়, শৃঙ্খলা ও সৎকর্মের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শুভতার প্রতিষ্ঠাই হোক এই পবিত্র তিথির প্রকৃত বার্তা।
গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তাই বিরাজ করছে ভক্তি, আনন্দ ও উৎসবের আমেজ। বিঘ্নহর্তা ও সিদ্ধিদাতা শ্রীগণেশের কৃপায় মানুষের জীবনের অজ্ঞানতা, অশুভ ও সকল বাধা দূর হয়ে জ্ঞান, শান্তি, সাফল্য ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হোক—এই প্রার্থনাই ভক্তদের।
মতামত