নোয়াখালীর সদর উপজেলায় নিখোঁজের দুইদিন পর একটি পুকুর থেকে রঞ্জিত কুরী (৫৩) নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৪ মার্চ) বেলা প্রায় পৌনে ১১টার দিকে উপজেলার গোনাই রামশংকর এলাকার একটি পুকুরে তার ভাসমান মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত রঞ্জিত কুরী নোয়াখালী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রামশংকর এলাকার বাসিন্দা এবং প্রকাশ চন্দ্র কুরীর ছেলে। তিনি স্থানীয় বাঁধেরহাট বাজারে ওষুধের ব্যবসা করতেন বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরিবারের দাবি, গত বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া না গেলে শুক্রবার সুধারাম মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার স্ত্রী শিল্পি রানী কুরী।
শনিবার সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবেশী হেঞ্জু মিয়ার বাড়ির পুকুরে একটি মরদেহ ভাসতে দেখতে পান। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে সুধারাম মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, যে পুকুরে মরদেহটি পাওয়া গেছে, সেখানে রঞ্জিত কুরীর যাওয়ার কথা নয়। এ কারণেও ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঘটনাটিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে পরিবারের উত্থাপিত কিছু গুরুতর অভিযোগ। নিহতের স্ত্রী শিল্পি রানী কুরী সাংবাদিকদের জানান, তার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন আগে বাঁধেরহাট বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে দত্তেরহাট এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা টাকাপয়সা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। ওই ঘটনার পর একই এলাকার এক ব্যক্তি তাদের বাড়িতে এসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদা দেওয়ার পরও বুধবার রাতে রঞ্জিত কুরী নিখোঁজ হয়ে যান এবং দুইদিন পর তার মরদেহ উদ্ধার হয়।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, ছিনতাইয়ের ঘটনার পর রঞ্জিত কুরী পরিচিতজনদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। এমনকি বাড়িতে এসে চাঁদা নেওয়ার ঘটনাও তিনি কয়েকজনকে জানান এবং সহযোগিতা চান। তাকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও, অভিযোগ অনুযায়ী তিনি তা করার আগেই নিখোঁজ হয়ে যান। এই প্রেক্ষাপটে পরিবারের সন্দেহ, ঘটনাটি নিছক নিখোঁজ বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু নয়; বরং এর পেছনে পরিকল্পিত কোনো হত্যাকান্ড ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, থানায় জিডি করার পরও পুলিশ যথাযথ তৎপরতা দেখায়নি। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও উদ্ধার কার্যক্রমে অবহেলা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। পরিবারের অভিযোগ, সময়মতো গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান চালানো হলে হয়তো রঞ্জিত কুরীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারত, অথবা অন্তত ঘটনার রহস্য দ্রুত উন্মোচনের সুযোগ তৈরি হতো।
সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, নিহতের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রঞ্জিত কুরী আগে থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত