এনসিটিবির তথ্যমতে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩০ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো হবে। এর মধ্যে ২১ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজার বই মাধ্যমিকের, বাকিগুলো প্রাথমিক স্তরের। এরই মধ্যে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির পাঠ্যবই ছাপিয়ে উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হলেও ঘাপলা বেধেছে মাধ্যমিক স্তরের বই নিয়ে। বছর শেষ হলেও এখনো ছাপার বাকি সাড়ে ১১ কোটি পাঠ্যবই। ফলে বই ছাড়া ক্লাসে যেতে হবে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে।
অভিযোগ উঠেছে, এনসিটিবিতে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী একজন সদস্য ও তার বলয়ে থাকা আরও চারজন কর্মকর্তা বই আটকে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার তৎপরতায় লিপ্ত। বই ছাপার কাজে গতি বাড়ানোর পরিবর্তে গতি কমিয়ে দেওয়ার কাজ করছেন প্রতিষ্ঠানটির সদস্য ড. রিয়াদ চৌধুরী, ঊর্ধ্বতন ভান্ডার কর্মকর্তা আসাফ-উদ-দৌলা, সচিব ও তার দপ্তরের ‘আ’ আদ্যক্ষরের এক কর্মকর্তা। পাঁচটি পেপার মিলের সঙ্গে অঘোষিত চুক্তি করে বড় অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত এই চক্র। তাদের পছন্দের বাইরের মিল থেকে কাগজ কিনলে ইন্সপেকশন এজেন্ট দিয়ে তা বাতিল করানো হচ্ছে। ফলে প্রেস মালিকরা ওইসব পেপার মিল থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, শ্রেণিভিত্তিক বই ছাপানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা অষ্টম শ্রেণিতে। এই শ্রেণিতে ৪ কোটি ২ লাখ বইয়ের বিপরীতে ছাপা হয়েছে মাত্র ১৮ লাখ ৯ হাজার বই, যা মোট বইয়ের মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ। সপ্তম শ্রেণিতে ৪ কোটি ১৫ লাখ বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ৭০ লাখ ৫৫ হাজার। ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও তা সন্তোষজনক নয়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪ কোটি ৪৩ লাখ বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার বই আর নবম শ্রেণিতে ৫ কোটি ৭০ লাখ বইয়ের বিপরীতে ছাপা হয়েছে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার বই। নবম শ্রেণিতে এখনো ছাপার বাকি ২ কোটি ২০ লাখের বেশি বই।
সময়মতো বই ছাপা না হওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নভেম্বরের মধ্যে সব বই উপজেলা পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয় বছরের শুরুতে। গত মে মাসে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু সেখানে এক কোটির বেশি বই ছাপার কাজ পায় আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের ভাই রব্বানী জব্বার। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ মাস্টার সিমেক্স প্রেসের মালিক দেওয়ান আলী কবীর, শেখ হাসিনাকে নিয়ে একাধিক বই ছাপানো প্রতিষ্ঠান আগামী প্রকাশনী, তার ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান অনিন্দ্য প্রেস, ডিএমপির পলাতক পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠের প্রেস বারতোবাসহ অন্তত ১৫টি আওয়ামীপন্থি প্রেস মালিককে কাজ দেয় এনসিটিবি। পরে এসব অভিযোগ আসার পর ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণির ৬০৩ কোটি টাকার দরপত্র আটকে দেয় সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ (পারচেজ কমিটি)।
সূত্র বলছে, গত বছর বই ছাপা নিয়ে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটে। বহিষ্কৃত এনসিপি নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট নির্দিষ্ট পেপার মিল থেকে কাগজ কিনতে বাধ্য করা হয় প্রেসগুলোকে। একপর্যায়ে ২৮ শতাংশ শুল্ক মওকুফ করে বিদেশ থেকে ১০ হাজার টন কাগজ আমদানি করার সুযোগ দেয় এনসিটিবি। সেখানে তানভীর এবং রিয়াদ চৌধুরী সিন্ডিকেট ২৮ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য করে। এ নিয়ে গত ১৫ মে কালবেলা ‘তানভীরের জোরে কাগজ আনতে ২৮ কোটির তেলেসমাতি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), এনসিপির বহিষ্কৃত নেতা তানভীর এবং ৩৬টি প্রেসের মালিক জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসানের নেতৃত্বে একটি দল। লেটার এন কালার প্রেসে মালিক শেখ সিরাজ উদ্দিন, মাস্টার সিমেক্স মালিক দেওয়ান আলী কবীরসহ একাধিক প্রেস জিজ্ঞাসাবাদে কাগজ কেনাকাটায় দুর্নীতির তথ্য পায় সংস্থাটি। অথচ এই দুর্নীতিতে সরাসরি যুক্ত থেকেও অদৃশ্য কারণে ছাড় পায় এনসিটিবির ওই সময়ের চেয়ারম্যান রিয়াজুল হাসান, সচিব আল ফিরোজ ফেরদৌস ও সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ড. রিয়াদ চৌধুরী। যদিও চেয়ারম্যানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আটকে যায় আর সচিব আল ফিরোজ ফেরদৌসকে ওএসডি করা হয়, তবে রিয়াদ চৌধুরী আছেন বহাল তবিয়তে। এনসিটিবিতে বসে এখনো সব কলকাঠি নাড়েন তিনি। তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ বার ফাইল উঠালেও সচিবের দপ্তরে থাকা একজন কর্মকর্তা তা আটকে দেন।
এ বিষয়ে যুগ্ম সচিব (কলেজ-১) খোদেজা খাতুন কালবেলাকে বলেন, উনার বিষয়ে আমাদের কাছে প্রচুর অভিযোগ আছে। তার বদলির বিষয়টি নিয়ে কী হচ্ছে, তা সচিব ও উপদেষ্টার দপ্তর ভালো বলতে পারবেন।
৪৫ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্যে মন্ত্রণালয়-এনসিটিবির ৬ কর্মকর্তা: প্রেস মালিকদের অভিযোগ, মাধ্যমিক পর্যায়ে চারটি শ্রেণির বই ছাপানো ঘিরে মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির ছয়জন কর্মকর্তার সিন্ডিকেট কমিশন বাণিজ্য যুক্ত হয়েছেন। ২১ কোটি বই ছাপাতে ৬৫ হাজার টন কাগজ লাগবে। দেশে শতাধিক কাগজ মিল থাকলেও এনসিটিবি মাত্র পাঁচটি ছাড়া অন্য মিলের কাগজ অনুমোদন দিচ্ছে না। সিন্ডিকেট কাগজের টনপ্রতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা কমিশন বাণিজ্য করছে। শুধু মাধ্যমিক স্তরেই তারা ৪৫ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য করছে।
প্রেস মালিকরা বলছেন, বর্তমান কাগজের দাম টনপ্রতি ১ লাখ ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১৭ হাজারের মধ্যে। এনসিটিবি সব পেপার মিল থেকে কাগজ কেনার সুযোগ দিলে কাগজের দাম টনপ্রতি ১ লাখ ১০ হাজার টাকার নিচে নেমে আসবে। কিন্তু এনসিটিবির কাগজ সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন ভান্ডার কর্মকর্তা
আসাফ-উদ-দৌলা এবং অন্য দপ্তর থেকে সচিবের দপ্তরে আসা এক কর্মকর্তা, যিনি এনসিটিবির ওই সিন্ডিকেটকে রক্ষায় ফান্ড তৈরি করে বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী কালবেলাকে বলেন, দরপত্র বাতিল হওয়ায় ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণিতে একটু দেরি হচ্ছে। এই তিন শ্রেণি বাদে অন্য ক্লাসের বই শিক্ষার্থীরা পেয়ে যাবে এমন আশা তার। এনসিটিবির কাগজ সিন্ডিকেটের বিষয়ে তার জানা নেই মন্তব্য করে চেয়ারম্যান বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সব প্রেসের প্রতি সমান আচরণ করতে।
এনসিটিবি সিন্ডিকেট করে পেপার মিল থেকে কাগজ কেনাচ্ছে বলে ওঠা অভিযোগটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন এনসিটিবির সচিব মো. সাহতাব উদ্দিন। এমন সুযোগ এনসিটিবির আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি এই প্রতিবেদককে আরও খোঁজ নিতে বলেন।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, আগের দরপত্রে প্রাথমিক স্তর, নবম শ্রেণি ও ইবতেদায়ির ১৮ কোটি বেশি বই ছাপানো প্রায় শেষ। কিন্তু ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির দরপত্র বাতিল হওয়ার পরপরই হঠাৎ করে কাগজের মানে শিথিলতা আনা হয়। বাস্টিং ফ্যাক্টর ২০ থেকে কমিয়ে ১৮ এবং ওবিএমুক্ত কাগজের পরিবর্তে ওবিএযুক্ত কাগজ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, একই শিক্ষাবর্ষ, একই প্রাক্কলন ঠিক রেখে কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই কাগজের মানে ছাড় দেয় এনসিটিবি।
দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এনসিটিবির সদস্য রিয়াদ চৌধুরী বাতিল হওয়া তিনটি শ্রেণির বইয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি পছন্দের প্রেসকে বেশি কাজ পাইয়ে দিতে এমন সিদ্ধান্ত নেন। এতে তার পছন্দে দুটি প্রেস শুধু ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১০০ লটের বিপরীতে ৭০ লটের কাজ পায়। অন্যদিকে এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তার দাবি, বাস্টিং ফ্যাক্টর ২০, ওবিএমুক্ত এবং ৮৫-৯০ শতাংশ অপাসিটি—এই তিনটি শর্ত একসঙ্গে পূরণ করার সক্ষমতা বাংলাদেশের কোনো পেপার মিলেরই নেই। বাস্তবে বাস্টিং ফ্যাক্টর বাড়ালে ওবিএ আসে, আবার ওবিএমুক্ত হলে কাঙ্ক্ষিত অপাসিটি পাওয়া যায় না। তারপরও কেন কাগজের এমন মান ঠিক করা হয় জানতে চাইলে রিয়াদ চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, পেপার মিল, প্রেস মালিক, বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের বিশেষজ্ঞদের একাধিক বৈঠকের পরই মান নির্ধারণ করা হয়; কিন্তু কাজ শুরু হলে সবাই সেই মানের কাগজ দিতে পারছিল না। পরে সবার মতামতের ভিত্তিতে স্পেসিফিকেশন (মান) কিছুটা কমানো হয়েছে। যাতে কয়েকটি প্রেসের কাছে জিম্মি না হই।
আগের মানে কাগজ দিয়ে প্রাথমিক, নবম ও ইবতেদায়ি স্তরে প্রায় ১৭ কোটি বই কীভাবে ছাপানো হলো—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে পারেননি রিয়াদ চৌধুরী। তিনি বলেন, পরিস্থিতির কারণে অনেক কিছু করতে হয়। যদি দরপত্র বাতিল না হতো তাহলে কী করতেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি’র কোনো উত্তর নেই। তবে ছাপা হওয়া বইয়ে বাস্টিং এবং অপাসিটিতে আনঅফিসিয়ালটি বিশেষ ছাড় দিয়েছে এনসিটিবি।

৪৫ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্যে মন্ত্রণালয়-এনসিটিবির ৬ কর্মকর্তা: প্রেস মালিকদের অভিযোগ, মাধ্যমিক পর্যায়ে চারটি শ্রেণির বই ছাপানো ঘিরে মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির ছয়জন কর্মকর্তার সিন্ডিকেট কমিশন বাণিজ্য যুক্ত হয়েছেন। ২১ কোটি বই ছাপাতে ৬৫ হাজার টন কাগজ লাগবে। দেশে শতাধিক কাগজ মিল থাকলেও এনসিটিবি মাত্র পাঁচটি ছাড়া অন্য মিলের কাগজ অনুমোদন দিচ্ছে না। সিন্ডিকেট কাগজের টনপ্রতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা কমিশন বাণিজ্য করছে। শুধু মাধ্যমিক স্তরেই তারা ৪৫ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য করছে।
প্রেস মালিকরা বলছেন, বর্তমান কাগজের দাম টনপ্রতি ১ লাখ ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১৭ হাজারের মধ্যে। এনসিটিবি সব পেপার মিল থেকে কাগজ কেনার সুযোগ দিলে কাগজের দাম টনপ্রতি ১ লাখ ১০ হাজার টাকার নিচে নেমে আসবে। কিন্তু এনসিটিবির কাগজ সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন ভান্ডার কর্মকর্তা আসাফ-উদ-দৌলা এবং অন্য দপ্তর থেকে সচিবের দপ্তরে আসা এক কর্মকর্তা, যিনি এনসিটিবির ওই সিন্ডিকেটকে রক্ষায় ফান্ড তৈরি করে বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী কালবেলাকে বলেন, দরপত্র বাতিল হওয়ায় ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণিতে একটু দেরি হচ্ছে। এই তিন শ্রেণি বাদে অন্য ক্লাসের বই শিক্ষার্থীরা পেয়ে যাবে এমন আশা তার। এনসিটিবির কাগজ সিন্ডিকেটের বিষয়ে তার জানা নেই মন্তব্য করে চেয়ারম্যান বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সব প্রেসের প্রতি সমান আচরণ করতে।
এনসিটিবি সিন্ডিকেট করে পেপার মিল থেকে কাগজ কেনাচ্ছে বলে ওঠা অভিযোগটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন এনসিটিবির সচিব মো. সাহতাব উদ্দিন। এমন সুযোগ এনসিটিবির আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি এই প্রতিবেদককে আরও খোঁজ নিতে বলেন।
মতামত