কালের পরিক্রমায় ও নদী ভাঙনের কারণে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চিকনিকান্দি ইউনিয়নের সুতাবাড়িয়া গ্রামে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দয়াময়ী মন্দিরটি আজ বিলীন হওয়ার পথে, যার সিংহ দরজা ইতোমধ্যে তেঁতুলিয়া, সুতাবাড়ীয়া নদীতে বিলীন হয়েছে, যা এই প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনার অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
দয়াময়ী মন্দির নিয়ে রয়েছে অনেক পৌরানিক কাহিনী। জনশ্রুতি রয়েছে, অনেক কাল আগে কোনও এক রাতের আঁধারে মন্দির এলাকায় একটি প্রাচীন বেলগাছের তলার মাটিফুঁড়ে বেরহয় দয়াময়ী দেবীরমূর্তি।
ঠিক ওই রাতেই এলাকার জমিদার ভবানী শঙ্কর সেন স্বপ্নযোগে আদিষ্টহন দেবী মূতিব্রআবির্ভাব স্থলে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য।
আবার কারো কারো মতে-স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে জমিদার ভবানী শঙ্কর সেনগ্রামের পার্শ্ববর্তী নদীতে সূর্যস্নান করতে গিয়েপাথরের তৈরি দয়াময়ী দেবীরমূর্তিটি ভাসমান অবস্থায় দেখতে পান। ভাসমান ওই মূর্তিটি উদ্ধার করে এনে দয়াময়ী দেবীর নামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দয়াময়ী মন্দির।
শিবমন্দিরের উপরিভাগ গম্ভুজাকৃতির। এক সময় দয়াময়ী দেবী মন্দিরের প্রত্মতাত্তি¡ক সৌন্দর্য্যে আকৃষ্ট হয়ে দেশ-বিদেশ থেকে অগনিত মানুষ ছুটে আসতেন মন্দির দর্শনে।
বিশেষ করে শীত মৌসুমে দর্শনার্থীদের পদভারে জমজমাট থাকত সারাগ্রাম। প্রতিবছর মাঘ মাসের ১ তারিখ থেকে এক মাসব্যাপী মেলা বসতো মন্দির এলাকায়।
হাজার হাজার লোকসমবেত হতো মেলায়। কলকাতা থেকে নামী-দামী যাত্রাদলসহ দেশ-বিদেশের সাধু-সন্ন্যাসিরা এসে ভিড়জমাতেন মেলায়।
সনাতন ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থে দয়াময়ী দেবীর মন্দির এবং দয়াময়ী মেলার বিবরণ রয়েছে। সময়ের সাথে ঐতিহ্যবাহী দয়াময়ী মেলাটি এখন বছরে মাত্র একদিনের জন্য অনুষ্ঠিত হয় মাঘী সপ্তমীতে।
স্থানীয়রা জানান, মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সপ্তমীর দিন হিন্দু পরিবারের অনেক গৃহবধু মন্দির প্রাঙ্গণে এসে শাঁখারীদের কাছ থেকে নতুন শাঁখা ক্রয় করেন। অনেকে আবার বিভিন্ন রোগ-শোকে শিবপূজা এবং কালীপূজা করেন এখানে।
বর্তমানে নদীরপাড়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় এ মন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরের সিংহ দরজা অনেক আগেই নদীগর্ভে বিলীনহয়ে গেছে।
হুমকির মুখে রয়েছে পাঠাবলীর ঘর, কালীমন্দির, শিবমন্দির ও একমাত্র দীঘিটি। কালের বিবর্তন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে এ মন্দিরের সবকিছুই আজ বিলীন হওয়ার পথে।
স্থানীয় বাসিন্দা চৈতালী দেবনাথ(বিথী) হিন্দু নিউজকে জানান, প্রাচীন নিদর্শন এ মন্দিরটি অমূল্য প্রত্মসম্পদ। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং রক্ষণা বেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় প্রাচীন নিদর্শন দয়াময়ী দেবী মন্দির আজ ধ্বংস্তুপে পরিণত হতে চলেছে সবার চোখের সামনেই।
দয়াময়ী দেবী মন্দিরের পুরোহিত শ্রী পরিমল গাঙ্গুলি(৬০) বলেন, প্রতি বছর মাঘের সপ্তমিতে এখানে মেলা বসে। মেলায় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ আসেন। কিন্তু সংস্কারের অভাবে মন্দিরটি নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। এখনই সংস্কার না করা হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হয়তো মন্দিরটি বিলীন হয়ে যাবে।
প্রায় ২শ’ ২০ বছরের পুরানো স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা করা জরুরী বলেও দাবী জানিয়েছেন তিনি।


মতামত