কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫) হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি ইসমাইল হোসেন জনি (২৮)। সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের অন্যতম সদস্য জনির বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৫টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
ইসমাইল হোসেন জনি কুমিল্লা শহরের ধর্মপুর এলাকার মৃত হারুন মিয়ার ছেলে। তার বিরুদ্ধে চুরি-ছিনতাই ও মাদকের ৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় দুটি এবং লাকসাম রেলওয়ে থানায় তিনটি। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে আদালতে। মামলাগুলোর বিচার কাজ চলছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) কুমিল্লা র্যাব-১১ এর সিপিসি-২ এর কার্যালয় এবং সদর দক্ষিণ থানা পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অটোরিকশা চালক রাহাত হোসেন জুয়েল কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীকে কোথায় যাবেন- জানতে চাইলে তিনি জাঙ্গালিয়া যাবেন বলে বলে জানান। এ সময় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী অটোরিকশার পেছনের সিটে বসেন। কিছুক্ষণ পর যাত্রীর বেশে অটোরিকশায় ওঠেন চক্রের অন্য সদস্যরা। বুলেট বৈরাগীর সঙ্গে পেছনের সিটে বসেন চক্রের সদস্য সোহাগ এবং হৃদয়। অটোরিকশা চালু করে জাগুরঝুলি বিশ্বরোড থেকে রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ পরই বুলেট বৈরাগীর সঙ্গে অটোরিকশার পেছনের সিটে বসা হৃদয় ও সোহাগ ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করেন বুলেট বৈরাগীকে। এ সময় বুলেট বৈরাগীর সঙ্গে হৃদয় ও সোহাগের ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে ইসমাইল হোসেন জনি সামনের সিট থেকে পেছনে এসে বুলেট বৈরাগীর মাথায় সুইচ গিয়ার ধরে মারধর করেন। তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সঙ্গে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল ও কাঁধের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার হাড়াতলী এলাকায় এসে জনি, সোহাগ এবং হৃদয় মিলে বুলেট বৈরাগীকে চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে সড়কে ফেলে দেন। এতে মাথার পেছনের অংশ এবং মুখমন্ডলে গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বুলেট বৈরাগী।
বুলেট বৈরাগীকে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে হৃদয়, জনি এবং সুজন অটোরিকশা চালক জুয়েলের বাড়িতে অবস্থান নেন। সোহাগ চলে যান কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনে। রোববার কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন থেকে সর্বপ্রথম সোহাগকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে তার দেওয়া তথ্যমতে, জুয়েলের বাড়ি থেকে জুয়েল, হৃদয়, জনি এবং সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ৫ জনের মধ্যে ইসমাইল হোসেন জনি ছাড়া সোহাগ, হৃদয়, জুয়েল এবং সুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি না দেওয়ায় জনির ১০ রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত তার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে রিমান্ডে আছেন জনি। বাকি চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টিটু কুমার নাথ বলেন, গ্রেপ্তারকৃত ৫ জনের মধ্যে চারজনই দায় স্বীকার করেছেন। ইসমাইল হোসেন জনি জবানবন্দি না দেওয়ায় আবেদনের প্রেক্ষিতে তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার ( ২৫ এপ্রিল) রাতে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনিং শেষ করে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন কাস্টমস, ভ্যাট এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫)। পথিমধ্যে পরিবারের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে কথা হয়। সর্বশেষ রাত ২টা ২৫ মিনিটের দিকে তিনি ফোন করে জানান, তিনি কুমিল্লা নগরীর টমছম ব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছেন। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তিনি বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা কল দিলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পান। সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো হদিস না পেয়ে পরদিন শনিবার সকালে বাবা সুশীল বৈরাগী কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
পরদিন শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি আইরিশ হোটেলের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত বুলেট বৈরাগী কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। দীর্ঘদিন কুমিল্লা কাস্টমস অফিসে কর্মরত ছিলেন তিনি। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় উপজেলার ডুমুরিয়া এলাকার সুশীল বৈরাগীর ছেলে। ৪১তম বিসিএস নন ক্যাডার পদে কাস্টমস, ভ্যাট এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দেন। পরিবারে তার স্ত্রী বাবা-মা ও ১ বছরের ছেলে সন্তান রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ৫ জনকে রোববার (২৬ এপ্রিল) কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
মতামত