সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় জীবনে শুরু হলো পূর্বপুরুষ স্মরণের বিশেষ সময় পিতৃপক্ষ। আজ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই পক্ষজুড়ে প্রয়াত পিতৃপুরুষদের স্মরণে শ্রাদ্ধ, তর্পণ, অন্ন-জল নিবেদন ও দানের মতো বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হবে। পিতৃপক্ষকে সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও পারিবারিক ঐতিহ্য স্মরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা হয়।
চান্দ্র পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী, একটি চন্দ্রমাস দুই ভাগে বিভক্ত—শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ। বছরের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে পিতৃপক্ষের রয়েছে আলাদা ধর্মীয় তাৎপর্য। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে সাধারণভাবে পিতৃপক্ষ বলা হয়। অনেক ধর্মীয় গ্রন্থ ও আঞ্চলিক রীতিতে একে অপরপক্ষ নামেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের জীবনে পিতা-মাতা ও পূর্বপুরুষের অবদান স্মরণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য পিতৃপক্ষে বিভিন্ন আচার পালন করা হয়।
এই সময়ে পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণ করে তাঁদের উদ্দেশ্যে জল ও তিল নিবেদন করা হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী অন্নদান, দান-দক্ষিণা এবং ব্রাহ্মণ ভোজনের মতো ধর্মীয় রীতিও অনেক পরিবারে প্রচলিত রয়েছে।
তর্পণের মাধ্যমে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল নিবেদন করা হয়। অনেকেই পবিত্র জলাশয় বা নদীর তীরে গিয়ে এই আচার সম্পন্ন করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার সঙ্গে নিবেদিত জল ও অন্ন তাঁদের প্রতি কর্তব্য পালনের প্রতীক।
পিতৃপক্ষের সঙ্গে মহাভারতের বীর কর্ণের একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি জড়িয়ে আছে।
কাহিনি অনুযায়ী, মৃত্যুর পর কর্ণ স্বর্গলোকে পৌঁছালে তাঁকে অন্নের পরিবর্তে সোনা ও ধনরত্ন দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশ্ন করলে তাঁকে জানানো হয়—জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য মানুষকে সোনা, ধনসম্পদ ও অন্যান্য সামগ্রী দান করলেও পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল দান করেননি।
কর্ণ তখন নিজের পরিস্থিতির কথা জানান। তিনি বলেন, নিজের প্রকৃত জন্মপরিচয় সম্পর্কে যুদ্ধের অল্প আগে জানতে পেরেছিলেন। ফলে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে যথাযথভাবে শ্রাদ্ধ বা তর্পণ করার সুযোগ তাঁর হয়নি।
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এরপর কর্ণকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মর্ত্যে ফিরে এসে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল নিবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়। কর্ণ সেই সময় পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন-জল দান করেন। এই কাহিনির সঙ্গে পিতৃপক্ষ পালনের ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে অনেকে যুক্ত করেন।
পিতৃপক্ষের শেষ তিথি হলো অমাবস্যা। এই অমাবস্যাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহালয়া নামে পরিচিত।
মহালয়া মূলত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের বিশেষ দিন। এদিন বহু মানুষ পবিত্র নদী বা জলাশয়ের তীরে গিয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেন। পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।
তবে মহালয়ার তাৎপর্য এখানেই শেষ নয়। পিতৃপক্ষের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দেবীপক্ষের আগমনী আবহ। তাই মহালয়াকে একদিকে পিতৃপক্ষের সমাপ্তি এবং অন্যদিকে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তার গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে দেখা হয়।
মহালয়ার পর শুরু হয় দেবীপক্ষ বা মাতৃপক্ষ। এই সময়কে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে দেবী আরাধনার প্রস্তুতি শুরু হয়।
সনাতন ধর্মীয় দর্শনে দেবীকে আদিশক্তির প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি শক্তি, মঙ্গল, করুণা ও সৃষ্টির প্রতীক। দেবীপক্ষে ভক্তরা দেবীর কাছে পরিবার ও সমাজের মঙ্গল, শান্তি, শক্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
অঞ্চল ও পঞ্জিকা অনুসারে দেবী আরাধনা শুরুর সময়ের কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো অঞ্চলে প্রতিপদ থেকেই দেবী বন্দনা শুরু করার রীতি রয়েছে। আবার বাংলার প্রচলিত দুর্গাপূজা পদ্ধতিতে ষষ্ঠী তিথি থেকে মূল দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
পিতৃপক্ষকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার সময় হিসেবে না দেখে আত্মসংযম, পূর্বপুরুষের স্মরণ এবং নিজের পারিবারিক শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সময় হিসেবেও দেখা হয়।
ধর্মীয় রীতিতে এই সময়ে অনেকে নিরামিষ আহার, সংযম ও বিভিন্ন বিধি পালন করেন। তবে কোন পরিবার কীভাবে পিতৃপক্ষের আচার পালন করবে, তা পারিবারিক প্রথা, আঞ্চলিক রীতি ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় পঞ্জিকার ওপর নির্ভর করে।
পিতৃপক্ষের মূল শিক্ষা হিসেবে পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার বিষয়টি সামনে আসে। জীবনের সঙ্গে যাঁদের অবদান জড়িয়ে আছে, তাঁদের স্মরণ করার মধ্য দিয়ে পারিবারিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে পিতৃপক্ষের পর দেবীপক্ষ শুরু হওয়ায় সনাতন ধর্মীয় বর্ষপঞ্জিতে এটি হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়। পিতৃস্মরণের আবহ পেরিয়ে শুরু হয় শক্তির আরাধনা এবং শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতীক্ষা।
আজ থেকে শুরু হওয়া পিতৃপক্ষ তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে শুধু একটি পক্ষ নয়—এটি পূর্বপুরুষকে স্মরণ, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং আত্মসংযমের মধ্য দিয়ে দেবী আরাধনার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্ব।
মতামত