সনাতন ধর্মের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে অগ্নিকুণ্ডের মতো প্রজ্জ্বলিত নানা অলৌকিক উপাখ্যান। আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সনাতনী পরম শ্রদ্ধায় যাঁকে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের বা পুরী ধামের শ্রীজগন্নাথ দেব হিসেবে পূজা করেন, তিনি আদিতে এই রূপে ছিলেন না। স্কন্দ পুরাণের উৎকল খণ্ড এবং ব্রহ্ম পুরাণের প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কলিযুগের এই পরম আরাধ্য দেবতা একসময় উড়িষ্যার ঘন জঙ্গলের গভীরে নীলকান্ত মণির তৈরি এক পরম সুন্দর চতুর্ভুজ মূর্তি রূপে পূজিত হতেন, যাঁর নাম ছিল 'নীলমাধব'। উড়িষ্যার জঙ্গলমহলের আদিবাসী শবর রাজ বিশ্বাবসু পরম গোপনে পরমেশ্বর বিষ্ণুর এই নীলমাধব রূপের আরাধনা করতেন। আবহমান কাল ধরে চলে আসা আদিবাসী সমাজের এই গোপন উপাসনাই কীভাবে আজকের বিশ্ববিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরের রূপ নিল এবং কেনই বা নীলমণির সেই অপরূপ মূর্তি ছেড়ে ভগবান কাঠের এক অদ্ভুত ও অসম্পূর্ণ রূপ ধারণ করলেন, তা সনাতন ইতিহাসের অন্যতম এক রহস্যময় অধ্যায়।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, মালব দেশের পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পৃথিবীতে ভগবানের এমন এক অনন্য রূপের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যা পূর্বে কেউ কখনো দেখেনি। ভগবানের অন্বেষণে তিনি তাঁর পুরোহিত বিদ্যাপতিকে উৎকল অঞ্চলে পাঠান। চতুর বিদ্যাপতি আদিবাসী রাজা বিশ্বাবসুর কন্যা ললিতাকে বিবাহ করে শ্বশুরের চোখ বেঁধে সেই গোপন গুহায় পৌঁছান এবং চতুরতার সাথে রাস্তায় শর্ষের বীজ ফেলে আসেন। পরবর্তীতে শর্ষে গাছ গজালে সেই পথ ধরে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে নীলমাধবকে উদ্ধার করতে এলেন, তখন ভক্তের গোপনতা রক্ষার্থে ভগবান অন্তর্ধান হয়ে যান। মূর্তি না পেয়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত নিলে ভগবান তাঁকে শূন্যবাণীতে জানান যে, তিনি আর নীলকান্ত মণিরূপে পূজা নেবেন না; বরং সমুদ্রের জলে ভেসে আসা একটি বিশেষ অলৌকিক কাঠের গুঁড়ি বা 'দারুব্রহ্ম' দিয়ে যেন তাঁর মূর্তি নির্মাণ করা হয়।
পরবর্তীতে সমুদ্রের তীরে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্মের চিহ্নযুক্ত এক বিশাল সুগন্ধি কাঠের গুঁড়ি ভেসে এলে রাজার সমস্ত হাতি ও সৈন্য মিলেও তা জল থেকে তুলতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু যখন রাজা তাঁর অহংকার ত্যাগ করে আদিবাসী শবর রাজ বিশ্বাবসু এবং পুরোহিত বিদ্যাপতিকে একসাথে যুক্ত করলেন, তখন সেই কাঠ অনায়াসে তীরে উঠে আসে—যা প্রমাণ করে ভগবানের কাছে জাতি-বর্ণের কোনো ভেদ নেই এবং আদিবাসী ও সনাতন সংস্কৃতির মিলনই জগন্নাথ সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। এই দারুব্রহ্মে কোনো সাধারণ ছেনি বা কুড়ুল দাগ কাটতে না পারায় স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে ২১ দিন বন্ধ ঘরে মূর্তি গড়ার শর্তে কাজ শুরু করেন। কিন্তু চতুর্দশ দিনে ঘরের ভেতর থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে রানী গুণ্ডিচার ব্যাকুলতায় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন শর্ত ভেঙে ঘরের দরজা খুলে ফেলেন।
দরজা খুলতেই দেখা যায় বৃদ্ধ ভাস্কর অদৃশ্য এবং ভেতরে পড়ে আছে হাত-পা হীন, বড় বড় গোলাকার চোখের তিনটি অসম্পূর্ণ মূর্তি। রাজা ও রানী গভীর শোকে ভেঙে পড়লে ভগবান পুনরায় দর্শন দিয়ে বলেন যে, কলিযুগে তিনি এই অসম্পূর্ণ রূপেই বিরাজ করবেন এবং হাত-পা না থাকলেও ভক্তের দেওয়া সমস্ত ভোগ গ্রহণ করে তাঁর বিশাল চোখ দিয়ে পতিত ও আর্ত ভক্তদের ওপর সবসময় কৃপাদৃষ্টি রাখবেন। এই অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়েই নীলগিরি পাহাড়ের গোপন 'নীলমাধব' আজ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নাথ 'শ্রীজগন্নাথ' রূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন, যা যুগ যুগ ধরে মানবজাতির অধিকার, সাম্য এবং সনাতনী বিশ্বাসের এক পরম প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
মতামত