ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগণিত পৌরাণিক নিদর্শন ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মধ্যে রাজস্থানের বীকানেরের অদূরে অবস্থিত করণী মাতার মন্দির এক অনন্য বিস্ময় হিসেবে পরিচিত। মার্বেলের কারুকার্যখচিত ও রুপোর দরজা সংবলিত এই মন্দিরে পা রাখলেই চোখে পড়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। মন্দিরের গর্ভগৃহ, দেয়াল, মেঝೆಯಿಂದ শুরু করে সর্বত্র হাজার হাজার ইঁদুরের অবাধ বিচরণ। কেউ কোনো গর্ত থেকে মুখ বের করে উঁকি দিচ্ছে, আবার কেউ সানন্দে থালায় রাখা লাড্ডু কিংবা বাটিতে রাখা দুধ পান করছে। ভক্তরা অত্যন্ত ভক্তিভরে করণী মাতার পাশাপাশি এই হাজার হাজার ইঁদুরকেও পূজা করেন এবং নৈবেদ্য নিবেদন করেন। এই ইঁদুরদের কেবল সাধারণ কোনো জীব মনে করা হয় না, বরং স্বয়ং দেবীর সন্তান বা 'কাবা' হিসেবে গণ্য করা হয়। হিন্দু ধর্ম ও সনাতন ঐতিহ্যের গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও জীবপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই প্রাঙ্গণ।
এই অলৌকিক ঐতিহ্যের নেপথ্যে রয়েছে এক হৃদয়স্পর্শী পৌরাণিক গল্প। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে, করণী মাতার সৎপুত্র লক্ষ্মণ কপিল সরোবরে ডুবে অকালে প্রাণ হারিয়েছিলেন। পুত্রশোকে ব্যাকুল মায়ের আকুল প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে মৃত্যুর দেবতা যমরাজ এক বিশেষ শর্তে তাকে পুনর্জীবন প্রদান করেন। শর্তটি ছিল, লক্ষ্মণ এবং তার বংশধরেরা মানুষ নয়, বরং ইঁদুর রূপে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন এবং দেবীর আশ্রয়েই অবস্থান করবেন। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') সেই থেকে সনাতনী সমাজে বিশ্বাস গড়ে ওঠে যে, এই মন্দিরে বিচরণকারী প্রতিটি ইঁদুরই করণী মাতার পরম পবিত্র সন্তান। সময়ের সাথে সাথে সংখ্যায় বাড়তে বাড়তে বর্তমানে সেখানে ইঁদুরের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক ইঁদুরের উপস্থিতি সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কোনো দর্শনার্থী অসুস্থ হননি কিংবা কোনো মহামারী ছড়ায়নি, যা সনাতন ধর্মের এক পরম আধ্যাত্মিক অলৌকিকতাকেই নির্দেশ করে।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বীকানেরের মহারাজা গঙ্গা সিংহ রাজস্থানী স্থাপত্যশৈলীতে এই ঐতিহাসিক মন্দিরটি সংস্কার ও প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের অন্তঃপুরে অধিষ্ঠিত রয়েছে ৭৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ দেবী করণী মাতার পবিত্র মূর্তি, যার এক হাতে ত্রিশূল শোভা পাচ্ছে এবং তিনি অলঙ্কৃত মুকুট ও মালায় সজ্জিত। এখানে ইঁদুরদের মধ্যে কোনো সাদা ইঁদুর চোখে পড়লে তাকে অত্যন্ত সৌভাগ্য ও পরম পবিত্র বলে মনে করা হয়। এই প্রাঙ্গণে ইঁদুর হত্যা বা অনিচ্ছাকৃত ক্ষতি করা ঘোর মহাপাপ হিসেবে বিবেচিত হয়; নিয়ম অনুযায়ী কেউ ভুলবশত কোনো ইঁদুরের ক্ষতি করলে তাকে সমপরিমাণ স্বর্ণের ইঁদুর বানিয়ে দেবীর চরণে প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে প্রদান করতে হয়। প্রতিদিন ভোর চারটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভক্তদের দর্শনের জন্য মন্দির খোলা থাকে এবং প্রতি নবরাত্রিতে এখানে বর্ণাঢ্য মেলার আয়োজন করা হয়। রাজস্থানের বীকানের থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে দেশনোক নামক স্থানে অবস্থিত এই প্রাচীন ধাম বিশ্বজুড়ে সনাতন সংস্কৃতির মহিমা ও বৈচিত্র্যকে পরম শ্রদ্ধায় তুলে ধরছে।
মতামত