ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা শাখার উদ্যোগে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কুলকুর্মাই সার্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা, কালী ও শ্রীকৃষ্ণ মন্দির প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সকাল থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও ভক্তদের সমাগম ঘটতে থাকে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, গীতা পাঠ, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।
দিনব্যাপী কর্মসূচির শুরুতে অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। উদ্বোধনের পর ধর্মীয় আবহে বের করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন বয়সী ভক্ত ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অংশগ্রহণ করেন।
শোভাযাত্রাটি উৎসবস্থলের আশপাশের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় মন্দির প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। এ সময় ভক্তদের অংশগ্রহণে পুরো এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
শোভাযাত্রা শেষে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ। অনুষ্ঠানে বক্তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবনাদর্শ, কর্মযোগ, ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার শিক্ষা এবং মানবকল্যাণে গীতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বক্তারা বলেন, শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও গীতার বাণী মানুষের মাঝে সত্য, ন্যায়, কর্তব্যবোধ, আত্মসংযম ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। বর্তমান সময়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে এসব মূল্যবোধের চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শ্লোক পাঠে অংশ নেয়। তাদের সাবলীল ও ভক্তিপূর্ণ কণ্ঠে গীতার শ্লোক পাঠ উপস্থিত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, শিশু-কিশোরদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও শাস্ত্রচর্চার আগ্রহ তৈরি করাই এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
গীতা পাঠ প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন গীতা বিদ্যা নিকেতনের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় শ্রীকৃষ্ণের জীবন, আদর্শ ও ধর্মীয় চেতনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ পর্ব উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
দিনের বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পূজা। ভক্তরা ধর্মীয় রীতি ও আচার অনুসরণ করে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন।
পরে অনুষ্ঠিত হয় পুষ্পাঞ্জলি প্রদান। ভক্তরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে পরিবার, সমাজ ও দেশ-জাতির শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করেন।
শ্রীগীতা পাঠ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজয়ীদের নির্বাচন শেষে আয়োজিত হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা হয় এবং ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যতেও গীতা ও সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্রচর্চায় মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজমুল হাসান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সার্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দিরের সভাপতি প্রকৌশলী সমীর দাশ তপন, বিজয় কুমার সেন, ডা. উৎপল নাথ, মাস্টার নির্মল চন্দ্র শীল, দিলীপ কুমার দাশ ও সত্যপদ দে।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক শম্ভু কান্তি বিশ্বাস, সদস্য সচিব শিপন সাহা এবং সদস্য সুনীল শ্যাম, প্রকাশ কুমার শীল, মিলন বিশ্বাস, টুটুন দাশ গুপ্ত, উজ্জ্বল কুমার নাথ, স্বপন কুমার দে ও স্বপন কান্তি শীলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
আলোচনা সভায় বক্তারা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, ধর্মের মূল শিক্ষা হলো সত্য, ন্যায়, মানবতা ও কল্যাণের পথে চলা। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যে কর্ম, কর্তব্য ও ন্যায়ের শিক্ষা দিয়েছেন, তা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
তারা শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
দিনব্যাপী পূজা-অর্চনা, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, গীতা পাঠ, গীতা পাঠ প্রতিযোগিতা, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুষ্পাঞ্জলি ও পুরস্কার বিতরণসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী উদযাপিত হয়।
সবশেষে উপস্থিত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। প্রসাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী জন্মাষ্টমী উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
ধর্মীয় চেতনা, শাস্ত্রচর্চা, শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ এবং সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে রাঙ্গুনিয়ার এ জন্মাষ্টমী আয়োজন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

মতামত