হাওরবেষ্টিত হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পালপাড়া গ্রামে যুগ যুগ ধরে প্রস্ফুটিত হয়ে আসছে সনাতনী শিল্পকলা ও ভক্তির এক অনন্য নিদর্শন। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই গ্রামের প্রতি ঘরে ঘরে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মৃৎশিল্পের যে বিপ্লব ঘটে চলেছে, তার মূলে রয়েছেন সনাতনী নারী কারিগররা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গোৎসব কেবল একটি উৎসব নয়, এটি মনের আত্মিক নিবেদন ও সাকার উপাসনার এক পবিত্র মাধ্যম। মূর্তিপূজা ও সাকার উপাসনার মূল দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অভ্র অর্পন নামের এক সনাতনী বলেন, "সনাতনীরা মূর্তিপূজা করি আমাদের মনকে একাগ্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। মন তো অনেক কিছুই চায়, চিন্তা শুধু ছুটাছুটি করে এদিক-সেদিক। সাকার উপাসনার অর্থই হলো, কিছু একটাকে অবলম্বন করে নিজের চিন্তার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আনা। সাকার উপাসনার পরবর্তী ধাপ হলো নিরাকার উপাসনা, সেটা সাধুরা এখনও করেন বনে-জঙ্গলে, হিমালয়ে। মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করি, মা যেন আমাদের চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে শেখান, আমাদের ধৈর্য যেন আরও বাড়িয়ে দেন। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও যেন হাসিমুখে সবাইকে ভালোবেসে একসাথে মানবকল্যাণে অনেক ভূমিকা রাখতে পারি।" অভ্র অর্পণের এই প্রার্থনার প্রতিধ্বনি ফুটে ওঠে পালপাড়ার নারীদের হাতের স্পর্শে, যারা পরম ভক্তিতে মাটির প্রতিমায় রূপ দেন দেবীকে।
সাধারণত প্রতিমা তৈরির কাজে পুরুষদের প্রাধান্য দেখা গেলেও পালপাড়ায় দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুরুষরা কেবল বাঁশ ও খড়ের প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করার পর মূল কাজ অর্থাৎ মাটি মাখা, নিখুঁত অবয়ব প্রদান, রং তুলির আঁচড় ও দেবীর রূপসজ্জার যাবতীয় গুরুদায়িত্ব পরম মমতায় সামলান নারী কারিগররা। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে এই শিল্পের সাথে যুক্ত নিয়তি রানী পালের মতো অসংখ্য নারী মৃৎশিল্পী এখানে দিনরাত পরিশ্রম করছেন। কেবল নিয়তি রানীই নন, মীরা, নেপাল, প্রতিমা পাল, প্রমিলা পাল, কাজল পাল এবং সীতা পালের মতো বহু নারী কারিগর তাঁদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় মা দুর্গাকে মর্ত্যে আবাহনের জন্য গড়ে তুলছেন। এমনকি পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলা যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, বাহুবল, মাধবপুর এবং সুনামগঞ্জ থেকেও দেবী প্রতিমার আগমনী বার্তা নিয়ে বায়মা আসছে এই গ্রামে।
তবে সনাতনী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এই মূল ভিত্তি ধারণকারী কারিগররা আজও অবহেলিত ও প্রান্তিক পর্যায়ে দিন কাটাচ্ছেন। প্রমিলা পালের মতো বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীরা ক্ষোভ ও আক্ষেপের সাথে জানান, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শিল্প চর্চা করে আসলেও কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক, সরকারি বা আর্থিক সহায়তা তাঁরা পাননি। জরাজীর্ণ ও অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে একদিকে যেমন প্রতিমা তৈরির কাঁচামাল আনতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়, অন্যদিকে তৈরি করা প্রতিমা যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') সনাতনীদের এই মৌলিক অধিকার ও কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা তাদের শিল্পকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি প্রানেশ ভট্টাচার্য জানান, পালপাড়ার প্রতিমা শিল্পীদের হাতের কাজ ও সুলভ মূল্যের কারণে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস প্রদান করে বলা হয়েছে, মৃৎশিল্পীদের সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। সকল প্রতিকূলতা ও অবহেলার মাঝেও সনাতনী নারী কারিগররা মা দুর্গার চরণে নিজেদের নিবেদন করে ধৈর্য ধরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যেন শত সংকটের মধ্যেও মানবকল্যাণে অটল থাকা যায়।
মতামত