সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিশেষ করে শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবার ভক্তদের কাছে রাখের উপবাস একটি পরিচিত ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ব্রত। কার্তিক মাসের শেষ ১৫ দিনের প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার এ ব্রত পালন করা হয়। দিনভর উপবাস শেষে সূর্যাস্তের সময় ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালন করে ভক্তরা বাবা লোকনাথের কাছে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু, শান্তি এবং মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন।
উপবাস ও প্রদীপ প্রজ্বালনের রীতি
রাখের উপবাস মূলত উপবাস, ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালন ও সমবেত প্রার্থনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি ধর্মীয় আচার। এদিন ভক্তরা সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করেন। বিকেলের দিকে লোকনাথ মন্দির কিংবা আশ্রম প্রাঙ্গণে গিয়ে মাটির প্রদীপ সাজিয়ে বসেন। প্রদীপে ঘি ও সলতে ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি থাকে ধূপ, ফুল, ধান-দূর্বাসহ পূজার প্রয়োজনীয় উপকরণ।
সূর্যাস্তের সময় ঘণ্টাধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে একযোগে প্রজ্বালন করা হয় ঘৃতপ্রদীপ। এ সময় ভক্তরা বাবা লোকনাথকে স্মরণ করে আপনজনের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। অনেকেই পরিবারের প্রত্যেক সদস্য কিংবা প্রিয়জনের নামে আলাদা প্রদীপ জ্বালান। পূজা-অর্চনা ও প্রার্থনা শেষে হবিশ্য অন্ন প্রসাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে উপবাস ভঙ্গ করেন।
বিভিন্ন এলাকায় এ ব্রত কার্তিক ব্রত, গোঁসাইয়ের উপবাস ও ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালন নামেও পরিচিত।
বাবা লোকনাথের জীবন ও ভক্তদের বিশ্বাস
ভক্তদের প্রচলিত জীবনী অনুযায়ী, শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জন্ম ১১৩৭ বঙ্গাব্দে, ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে, জন্মাষ্টমী তিথিতে অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত অঞ্চলের চৌরাশী চাকলা গ্রামে। মাত্র ১১ বছর বয়সে উপনয়নের পর তিনি সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে গুরু ভগবান গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন যোগসাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর জীবনীতে হিমালয়সহ বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ সাধনাজীবনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদীতে অবস্থান করেন। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই তাঁর তিরোধান ঘটে। বর্তমানে বারদীর শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম দেশের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।
ভক্তদের কাছে বাবা লোকনাথ কেবল একজন সাধক নন, বরং বিপদে-আপদে আশ্রয় ও ভরসার প্রতীক। তাঁর নামে প্রচলিত একটি বহুল পরিচিত আশ্বাস হলো—‘রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।’ এই বিশ্বাস থেকেই রাখের উপবাসে ভক্তরা নিজের পাশাপাশি আপনজনদের কল্যাণ কামনায় প্রদীপ জ্বালান।
রাখের উপবাসের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত লোককথা
রাখের উপবাসের উৎপত্তি নিয়ে ভক্তসমাজে কয়েকটি লোককথা প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি কাহিনিতে কলেরা ও বসন্তের মতো মহামারির প্রসঙ্গ উঠে আসে। অতীতে এসব রোগে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে বাবা লোকনাথ ভক্তদের কার্তিক মাসে উপবাস পালন এবং আশ্রম প্রাঙ্গণে ঘৃতপ্রদীপ ও ধূপধুনো জ্বালিয়ে প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ভক্তদের ধারণা, সেই নির্দেশনা থেকেই রাখের উপবাসের প্রচলন শুরু হয়।
অন্য একটি লোককথায় শীতলা দেবীর প্রসঙ্গ রয়েছে। বাংলার লোকবিশ্বাসে শীতলা দেবী বসন্ত রোগের দেবী হিসেবে পরিচিত। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একবার শীতলা দেবী বারদীর ওপর দিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে বাবা লোকনাথ তাঁকে অন্য পথ দিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। ওই পথে গেলে এলাকায় বসন্ত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন। পরে দেবী অন্য পথ দিয়ে চলে যান। এরপর বাবা লোকনাথ কার্তিক মাসে উপবাস ও প্রদীপ প্রজ্বালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এসব কাহিনি মূলত ভক্তসমাজে প্রচলিত লোকবিশ্বাস। এগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল কিংবা রাখের উপবাসের সূচনার নির্দিষ্ট সাল পাওয়া যায় না।
কার্তিক মাস ও প্রদীপ প্রজ্বালনের ঐতিহ্য
বাংলার সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে কার্তিক মাস প্রদীপ প্রজ্বালনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এ মাসে সন্ধ্যায় আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর প্রচলন রয়েছে। পাশাপাশি কার্তিকী অমাবস্যায় অনুষ্ঠিত হয় দীপাবলি ও শ্যামাপূজা। রাখের উপবাসও কার্তিক মাসের শেষার্ধকে কেন্দ্র করে পালিত হয়।
প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার ভক্তরা এ ব্রত পালন করেন। তবে সপ্তাহের এই দুটি দিন নির্ধারণের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। ভক্তদের কাছে এটি বাবা লোকনাথের নির্দেশ ও দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ।
‘রাখ’ শব্দটির সঙ্গে রক্ষা বা সুরক্ষার ভাব জড়িয়ে রয়েছে বলে প্রচলিত ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়। প্রিয়জনকে রোগ, শোক ও বিপদ থেকে রক্ষার প্রার্থনায় এ ব্রত পালন করা হয় বলেই এর নাম রাখের উপবাস—এমন ধারণা ভক্তসমাজে প্রচলিত।
২০২৬ সালে রাখের উপবাসের পাঁচ দিন
২০২৬ সালে কার্তিক মাসের শেষার্ধে রাখের উপবাসের পাঁচটি দিন পড়েছে। তারিখগুলো হলো—
১. ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার (১৬ কার্তিক)।
২. ৭ নভেম্বর, শনিবার (২০ কার্তিক)।
৩. ১০ নভেম্বর, মঙ্গলবার (২৩ কার্তিক)।
৪. ১৪ নভেম্বর, শনিবার (২৭ কার্তিক)।
৫. ১৭ নভেম্বর, মঙ্গলবার (৩০ কার্তিক)।
এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে লোকনাথভক্তদের উদ্যোগে উপবাস, পূজা-অর্চনা, ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালন ও সমবেত প্রার্থনার আয়োজন করা হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার শ্রীশ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু মহাউদ্বারণ মঠ প্রাঙ্গণে আগামী ১৪ নভেম্বর, শনিবার পঞ্চমবারের মতো রাখের উপবাস ও ঘৃতপ্রদীপ প্রজ্বালন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজনে ভক্তরা উপবাস পালন, প্রদীপ প্রজ্বালন ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে বাবা লোকনাথের প্রতি ভক্তি নিবেদন করবেন।
সব মিলিয়ে রাখের উপবাস কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; ভক্তদের কাছে এটি ভালোবাসা, আত্মসংযম, দায়িত্ববোধ ও প্রিয়জনের প্রতি নিঃস্বার্থ মঙ্গলকামনার এক বিশেষ প্রকাশ। নিজের সুখ-শান্তির পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও আপনজনদের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও নিরাপত্তা কামনায় প্রদীপের আলোয় প্রার্থনা করেন ভক্তরা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা লোকবিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও ভক্তির এই ধারাই রাখের উপবাসকে সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বিশেষ স্থান দিয়েছে।
মতামত