প্রণামের অর্থ ও প্রকারভেদ
শাস্ত্র অনুযায়ী প্রণাম চার প্রকার—সাষ্টাঙ্গ (অষ্টাঙ্গ), পঞ্চাঙ্গ, কায়িক ও বাচিক প্রণাম। দেবপূজা ও উপাসনায় সাষ্টাঙ্গ ও পঞ্চাঙ্গ প্রণামই সর্বাধিক প্রশস্ত বলে বিবেচিত। পূজা শেষে এই প্রণাম করা কর্তব্য এবং পূজাকালে পূজক আসনে উপবিষ্ট হয়ে করযোড়ে প্রণাম করবেন—এমন নির্দেশ শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।
সাষ্টাঙ্গ ও পঞ্চাঙ্গ প্রণামের বিধান
তন্ত্রসার গ্রন্থে বর্ণিত শ্লোক অনুযায়ী পদদ্বয়, হস্তদ্বয়, জানুদ্বয়, বক্ষ, মস্তক, চক্ষু, বাক্য ও মন—এই আট অঙ্গ দ্বারা সম্পন্ন প্রণামকে সাষ্টাঙ্গ বা অষ্টাঙ্গ প্রণাম বলা হয়। মহাকাল সংহিতায় একে দণ্ডবৎ প্রণাম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যেখানে দেহ সম্পূর্ণভাবে ভূমিতে নত হয়।
অন্যদিকে বৃহৎ তন্ত্রসার মতে বাহুদ্বয়, জানুদ্বয়, মস্তক, বাক্য ও চক্ষু—এই পাঁচ অঙ্গ দ্বারা সম্পন্ন প্রণামই পঞ্চাঙ্গ প্রণাম।
কায়িক ও বাচিক প্রণাম
কালিকা পুরাণ অনুযায়ী কায়িক প্রণামের তিনটি স্তর রয়েছে—জানু ও মস্তক দ্বারা ভূমি স্পর্শ করে প্রণাম উত্তম, কেবল মস্তক দ্বারা ভূমি স্পর্শ মধ্যম এবং শুধু করযোড়ে নমস্কার অধম। একই পুরাণে বাচিক প্রণামের ক্ষেত্রেও স্তরভেদ উল্লেখ করা হয়েছে; নিজস্ব গদ্য-পদ্য রচনা করে প্রণাম উত্তম, বৈদিক বা পৌরাণিক মন্ত্রোচ্চারণ মধ্যম এবং সাধারণ ভাষায় নমস্কার অধম হিসেবে বিবেচিত।
কোথায় ও কীভাবে প্রণাম করবেন
শাস্ত্র মতে ভগবদ্ বিগ্রহের একেবারে সম্মুখে সামনাসামনি, বিগ্রহের পিছনে কিংবা অতিরিক্ত নিকটে দাঁড়িয়ে প্রণাম করা নিষেধ। পুরোহিত দর্পণ গ্রন্থ অনুযায়ী বিষ্ণুকে নিজের বাম দিকে, শক্তি ও শঙ্করকে নিজের ডান দিকে এবং গুরুকে সম্মুখে রেখে প্রণাম করার বিধান রয়েছে। অন্যথায় প্রণাম নিষ্ফল হয় বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।
দেবী প্রণামের বিশেষ নির্দেশনা
তন্ত্র মতে দেবীর পট বা বিগ্রহ নিজের ডান দিকে রেখে আসনে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে হয়। খালি মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলে দেবী কুপিত হন—এমন বিশ্বাস প্রচলিত। দেবীর উদ্দেশ্যে কমপক্ষে তিনবার প্রণাম করার নির্দেশ রয়েছে।
প্রণামের মহিমা ও ফল
কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে, নমস্কারে দেবতা, মানুষ, গন্ধর্ব, যক্ষ ও রাক্ষস পর্যন্ত প্রীত হন এবং নমস্কারের মাধ্যমে চতুর্বর্গ লাভ, আয়ু বৃদ্ধি ও সর্বসিদ্ধি অর্জিত হয়। শাক্তানন্দ তরঙ্গিণী গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে—শ্রদ্ধাভরে দুর্গা দেবীকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয় এবং দুর্গালোক প্রাপ্তি ঘটে।
বিশেষ টীকা
শাস্ত্র মতে নারীদের জন্য পঞ্চাঙ্গ প্রণাম বিধেয় এবং পুরুষদের জন্য সাষ্টাঙ্গ প্রণাম আবশ্যক। ধর্মীয় আচার পালনে শুদ্ধতা ও ভক্তির পূর্ণতা অর্জনে এই শাস্ত্রসম্মত প্রণাম বিধি অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ধর্মতত্ত্ববিদরা।
এই শাস্ত্রবিধান অনুসরণ করলে প্রণাম কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ভক্তির পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ হিসেবে গণ্য হয়—এমনটাই মত সংশ্লিষ্ট ধর্মীয়

মতামত