১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর, বাংলা ১২৬০ সনের ৮ পৌষ, অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণা সপ্তমী তিথিতে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রাম জয়রামবাটীতে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীমা সারদাদেবী। দরিদ্র, ধর্মপরায়ণ ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর জীবন পরবর্তীতে হয়ে ওঠে অমর, মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস। পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কৃষিকাজ ও পুরোহিতবৃত্তি করে পরিবার চালাতেন; মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী ছিলেন গভীর ধর্মভক্ত। ছোটবেলায় সারদাদেবী ঘরের কাজকর্মের পাশাপাশি ভাইদের দেখাশোনা করতেন, ধানক্ষেত থেকে ঘাস কেটে গোরুদের জন্য নিয়ে আসতেন, প্রয়োজনে ধান কুড়াতেও অংশ নিতেন।
সারদাদেবীর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামীণ পাঠশালায় সীমিত হলেও, তিনি পরবর্তীতে কামারপুকুর ও শ্যামপুকুরে বিশেষভাবে লেখা-শেখা শিখেছিলেন। ছেলেবেলায় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তিনি গ্রামে আয়োজিত যাত্রা ও কথকতার আসর থেকে পৌরাণিক গল্প ও শ্লোক শেখেন। পুতুলখেলার সময় তিনি লক্ষ্মী ও কালীর মূর্তি গড়ে পূজা করতেন, যা তাঁর জীবনের প্রথম ধর্মচেতনার দিক নির্দেশক ছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাথে তাঁর বিবাহ হয়, যা তাঁকে এক কিংবদন্তী মাতৃরূপে পরিণত করে।
মা সারদা সর্বদা মানুষের প্রকৃত কল্যাণে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, "আমি সত্যিকারের মা; গুরুপত্নী নয়, পাতানো মা নয়, কথার কথা মা নয়–সত্য জননী।" নিজের গর্ভে সন্তান ধারণ না করেও কোটি কোটি মানুষকে তিনি নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তাঁর শাশ্বত বার্তা হলো: "যারা এসেছে, যারা আসেনি, যারা আসবে, আমার সকল সন্তানকে জানিয়ে দিও, মা, আমার ভালবাসা, আমার আশীর্বাদ সকলের ওপর আছে।"
"আমি সত্যিকারের মা; গুরুপত্নী নয়, পাতানো মা নয়, কথার কথা মা নয়–সত্য জননী।"
— মা সারদা

ধ্যান, জপ, পূজা, হোম ও কীর্তনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়—এটাই মা সারদার শিক্ষার মূল কথা। তিনি বলেছেন, "যেমন ফুল নাড়তে-চাড়তে ঘ্রাণ বের হয়, চন্দন ঘষতে ঘষতে গন্ধ বের হয়, তেমনি ভগবদতত্ত্বের আলোচনা করতে করতে তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়।"
প্রকৃত ভালবাসা ও নিষ্কাম আচরণ মানুষের মন জয় করতে পারে। মা সারদা বারবার স্মরণ করিয়েছেন, "ভালবাসায় সবকিছু হয়, জোর করে কায়দায় ফেলে কাউকে দিয়ে কিছু করানো যায় না।" এছাড়া তিনি সতসঙ্গের গুরুত্বের কথাও বলেছেন, "সৎসঙ্গে মেশো, ভাল হতে চেষ্টা কর, ক্রমে সব হবে।"
মা সারদা বিশ্বাস করতেন যে কাজ করা ও দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, "কাজ করা চাই বইকি, কর্ম করতে করতে কর্মের বন্ধন কেটে যায়, তবে নিষ্কাম ভাব আসে। একদণ্ডও কাজ ছেড়ে থাকা উচিত নয়।" নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক দ্বন্দ্ব থেকে উত্তরণেও তাঁর শিক্ষা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, "ভাঙতে সবাই পারে, গড়তে পারে কজনে? নিন্দা ঠাট্টা করতে পারে সব্বাই, কিন্তু কি করে যে তাকে ভাল করতে হবে, তা বলতে পারে ক'জনে?"
১৯২০ সালের ২০ জুলাই ৬৬ বছর বয়সে মা সারদা মহাসমাধী লাভ করেন কলকাতার বাগবাজারে, গঙ্গার পূর্বপারে অবস্থিত তাঁর বাড়িতে। সেই বাড়ি আজও “মায়ের বাড়ি” নামে পরিচিত এবং সমগ্র জগতে তিনি কৃপাময়ী মা হিসেবে স্মরণীয়। তাঁর প্রতিমা বা ছবির দিকে তাকালেই ভক্তরা শুধু কৃপাময়ী মাতৃভাব অনুভব করেন।
মতামত