বাংলাদেশের রাজধানীর হৃদয়ে অবস্থিত ঢাকেশ্বরী মন্দির শুধু একটি উপাসনালয় নয়, এটি বাঙালি হিন্দু সমাজের আধ্যাত্মিক চেতনা, ইতিহাস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীপ্রাচীন এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে কিংবদন্তি, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে টিকে থাকার গৌরবগাথা।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, বহু বছর আগে কিছু কাঠুরে জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে লতাপাতায় আচ্ছাদিত অবস্থায় অষ্টভূজা দেবী দুর্গার এক প্রাচীন বিগ্রহ আবিষ্কার করেন। জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে থাকা সেই দেবীমূর্তিকে কেন্দ্র করে প্রথমে একটি কুঁড়েঘর সদৃশ মন্দির নির্মিত হয়। স্থানটি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় দেবীকে ‘গঙ্গা দেবী’ রূপে পূজা শুরু হয়। দেবী লতা-পাতায় ঢাকা ছিলেন—এই বিশ্বাস থেকেই ‘ঢাকা’ ও ‘ঈশ্বরী’ মিলিয়ে মন্দিরের নাম হয় ‘ঢাকেশ্বরী’, অর্থাৎ আচ্ছাদিত দেবী।
ঐতিহাসিক সূত্র ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১১শ শতকে সেন আমলে এই মন্দির নতুন মাত্রা পায়। সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন–এর মাতা, যিনি বিজয় সেন–এর পত্নী, অষ্টমী স্নানের উদ্দেশ্যে লাঙ্গলবন্দে এসে রাত্রিবাসকালে স্বপ্নাদেশ পান যে পূর্ণ তীর্থসিদ্ধির জন্য দেবী দর্শন আবশ্যক। পরদিন তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এসে দেবীদর্শন করেন এবং অষ্টধাতু নির্মিত দশভূজা কাত্যায়নী মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দুর্গার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর দুই পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী, নিচে কার্তিক ও গণেশ, আর সিংহবাহিনী রূপে মহিষাসুর বধের প্রতিমূর্তি—এই শৈল্পিক বিন্যাস সেই সময়ের ধর্মীয় শিল্পরীতির সাক্ষ্য বহন করে। তিনি এককক্ষ বিশিষ্ট স্থায়ী মন্দির নির্মাণ এবং ভক্তদের জন্য তিনটি কূপ খনন করান। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গভীর রাতে দেবী নিজেই কূপে স্নান করে পুনরায় মন্দিরে প্রবেশ করতেন—এমন অলৌকিক কাহিনিও আজও প্রচলিত।
মোগল আমলে মন্দিরের স্থাপত্যে আসে নতুন পরিবর্তন। সম্রাট আকবর–এর সেনাপতি মানসিংহ বাংলায় এসে সোনারগাঁও অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনকালে মন্দিরের ভগ্নদশা লক্ষ্য করেন। তিনি রাজস্থান থেকে মিস্ত্রি এনে রাজস্থানি ঘরানায় মূল মন্দিরকে তিন কক্ষ বিশিষ্ট করেন এবং দেবীর দুই পাশে শিবলিঙ্গ স্থাপন করেন। নিরাপত্তার জন্য নির্মাণ করা হয় দুটি প্রবেশদ্বার, পাশাপাশি ধর্মশালা ও একটি পুকুর খনন করা হয়। তাঁর চারবার বাংলা আগমনের স্মারক হিসেবে চারটি শিবমঠও স্থাপিত হয়। দেবসেবার দায়িত্ব দেওয়া হয় আজমগড়ের এক তিওয়ারি পরিবারকে এবং রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত করা হয় দাস পরিবারকে।
পরবর্তী সময়ে ভাওয়ালের জমিদার রাজেন্দ্রনারায়ন রায় মন্দিরের সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবে সিএস রেকর্ডভুক্ত করেন এবং নির্দিষ্ট অংশ সেবায়েত ও রক্ষণাবেক্ষণকারীদের নামে প্রদান করেন। এতে মন্দিরের আইনি ভিত্তি সুসংহত হয়।
তবে ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ১৯৪৮ সালের সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে মন্দিরের আদি, প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো বিগ্রহটি গোপনে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেই আদি বিগ্রহ বিরাজ করছে কলকাতার কুমোরটুলির শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির–এ। জানা যায়, প্রথমে হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিটে এক ভক্তের বাড়িতে পূজিত হওয়ার পর ১৯৫০ সালে কুমোরটুলিতে স্থায়ী মন্দির নির্মিত হয়। আজও সেখানে উত্তর ভারতের নবরাত্রি বিধি অনুসারে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলার প্রচলিত শারদীয়া দুর্গোৎসবের রীতির থেকে ভিন্ন।
অন্যদিকে, ঢাকায় বর্তমানে যে বিগ্রহ পূজিত হচ্ছে তা মূল প্রতিমার প্রতিরূপ। তবু আধ্যাত্মিক গুরুত্বে কোনো ঘাটতি নেই। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ একাধিক আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগের ইতিহাস বুকে নিয়েও মন্দির আজও অটল। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশে মূল নকশা অনুসারে মন্দির পুনর্নির্মাণ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার সলিমুল্লাহ হলের দক্ষিণ-পশ্চিমে ঢাকেশ্বরী রোডে অবস্থিত এই মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে মূল গর্ভগৃহ, মহানগর পূজা মণ্ডপ, উত্তর-পশ্চিম কোণে চারটি শিব মন্দির, সন্তোষী মাতার মন্দির, প্রশাসনিক ভবন, অতিথিশালা, লাইব্রেরি, পুকুর ও ফুলের বাগান। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আরতি এবং সাপ্তাহিক নির্ধারিত দিনে সন্তোষী পূজা, শনি পূজা, শিব পূজা ও কীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গাপূজার সময় এখানে হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে।
ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির আজ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি ইতিহাসের ধারক, দেশভাগের বেদনা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও এক সম্প্রদায়ের আত্মত্যাগের প্রতীক। আর কলকাতার কুমোরটুলিতে নিভৃত গলিতে প্রতিষ্ঠিত আদি বিগ্রহ বহন করছে সেই প্রাচীন উত্তরাধিকার। দুই বাংলায় দুই অধ্যায়ে বিভক্ত হলেও, দেবী ঢাকেশ্বরী বাঙালি হিন্দু সমাজের চিরন্তন আধ্যাত্মিক বন্ধনের প্রতীক হয়ে আজও সমানভাবে পূজিতা।
মতামত