আজ গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রবর্তক, ভক্তিবাদের নবজাগরণ পুরুষ ও কৃষ্ণপ্রেমের অবতার শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর শুভ জন্মতিথি।
ভক্তিবাদী নবজাগরণের অগ্রদূত, গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের প্রবর্তক এবং কৃষ্ণপ্রেমের অবতার হিসেবে সমাদৃত শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুন পূর্ণিমা তিথিতে নদীয়ার নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মনাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র।
পিতা জগন্নাথ মিশ্র ও মাতা শচীদেবীর স্নেহে বেড়ে ওঠা এই অসাধারণ শিশু পরবর্তীকালে সমগ্র ভারতবর্ষে ভক্তি আন্দোলনের এক যুগান্তকারী রূপকার হয়ে ওঠেন। জন্মের সময় নিমগাছের নিচে তাঁর আবির্ভাব ঘটায় পরিবারে তিনি ‘নিমাই’ নামে পরিচিত হন।
শৈশব থেকেই নিমাই ছিলেন প্রখর মেধাবী ও চঞ্চল স্বভাবের। নবদ্বীপ তৎকালীন ভারতবর্ষের একটি প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। সেখানে ব্যাকরণ, ন্যায়শাস্ত্র ও যুক্তিবিদ্যায় তিনি অল্প বয়সেই পারদর্শিতা অর্জন করেন। কৈশোরে তিনি নিজেই পাঠশালা স্থাপন করে ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন। এই সময় পর্যন্ত তিনি মূলত বিদ্যাচর্চা ও পাণ্ডিত্যেই অধিক মনোযোগী ছিলেন।
তাঁর জীবনে আধ্যাত্মিক রূপান্তর আসে গয়ার বিষ্ণুপাদ মন্দিরে দীক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে। ঈশ্বরপুরীর নিকট দীক্ষা নেওয়ার পর তিনি গভীর কৃষ্ণভক্তিতে আত্মনিয়োগ করেন। নবদ্বীপে ফিরে এসে যুক্তিতর্ক পরিহার করে নামসংকীর্তনের মাধ্যমে ভক্তি প্রচার শুরু করেন। তাঁর কীর্তনে আবেগ, অশ্রু ও প্রেমোন্মাদনা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর আলোড়ন তোলে। ধীরে ধীরে তিনি এক বৃহৎ ভক্তসমাজ গড়ে তোলেন, যেখানে জাতি-বর্ণভেদ ভুলে সকলেই একসঙ্গে ‘হরিনাম’ কীর্তনে অংশগ্রহণ করতেন।


২৪ বছর বয়সে তিনি সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সন্ন্যাসের পর তাঁর নাম হয় ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’। এই সময় তিনি মাতা শচীদেবীর ইচ্ছায় নীলাচল পুরীতে অবস্থান শুরু করেন। পুরীর জগন্নাথ মন্দির-এ অবস্থানকালে তিনি গভীর ভক্তিভাবে শ্রীকৃষ্ণচিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন। রথযাত্রা উৎসবে তাঁর অংশগ্রহণ ও ভাবাবেশ ভক্তদের কাছে আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে।
সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি দক্ষিণ ভারত, বৃন্দাবনসহ বিভিন্ন তীর্থভ্রমণ করেন। এই ভ্রমণকালে তিনি অসংখ্য মানুষকে কৃষ্ণভক্তিতে দীক্ষিত করেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে রূপ ও সনাতন গোস্বামী, রঘুনাথ দাস প্রমুখ শিষ্য গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনকে সুসংহত ও শাস্ত্রসম্মত রূপ দেন। তাঁদের রচিত গ্রন্থসমূহ পরবর্তীকালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন ও লীলাকথা প্রধানত সংকলিত হয়েছে চৈতন্য চরিতামৃত ও চৈতন্য ভাগবত-এ। এসব গ্রন্থে তাঁর আধ্যাত্মিক ভাবাবেশ, দর্শন ও মানবপ্রেমের বাণী বিশদভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
জীবনের শেষ পর্বে তিনি পুরীতে অন্তর্মুখী সাধনায় অধিক সময় অতিবাহিত করেন। ভক্তদের মতে, তিনি কৃষ্ণপ্রেমে এমনভাবে নিমগ্ন থাকতেন যে কখনো কখনো তাঁর দেহে অলৌকিক ভাবপ্রকাশ দেখা যেত। ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে তাঁর লীলাসমাপ্তি ঘটে বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক মত প্রকাশ করেছেন।

শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি মানবতার চিরন্তন বার্তা স্মরণের এক পবিত্র দিন—যেখানে প্রেমই ধর্ম, ভক্তিই মুক্তির পথ এবং সকল প্রাণীর মধ্যে ঈশ্বরদর্শনের শিক্ষাই তাঁর অমর মাহাত্ম্য।
আজকের এই বিশেষ দিনে নবদ্বীপের শ্রীধাম মায়াপুর এবং জগন্নাথ ধাম পুরীতে অগণিত ভক্তের সমাগম ঘটেছে। ভোরে মঙ্গল আরতির মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়েছে, যা চলবে মধ্যরাত পর্যন্ত। বিভিন্ন মন্দিরে নামসংকীর্তন, শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত পাঠ এবং মহাপ্রভুর প্রিয় 'অষ্টক' উচ্চারিত হচ্ছে। আজকের এই সংঘাতময় বিশ্বে শ্রীচৈতন্যদেবের প্রেম ও অহিংসার বাণী আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রদর্শিত নাম-সংকীর্তন এবং সর্বজীবের প্রতি করুণার পথটিই হতে পারে আধুনিক মানুষের মুক্তির পরম আশ্রয়।
মতামত