ধর্মীয় শাস্ত্র ও পুরাণে উল্লেখ আছে, প্রাচীনকালে দেবী দুর্গার পূজা মূলত চৈত্র মাসের বসন্ত ঋতুতেই অনুষ্ঠিত হতো। বসন্ত মানেই নতুন জীবন, নতুন আশার সূচনা। গাছের ডালে নতুন পাতা, চারদিকে ফুলের সৌরভ—এই সময়েই মানুষ দেবী শক্তির কাছে প্রার্থনা করত জীবনের কল্যাণ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য।
এই বসন্তকালীন দুর্গাপূজাই ধীরে ধীরে পরিচিত হয় বাসন্তী পূজা নামে। দেবী দুর্গাকে তখন পূজা করা হতো মাতৃরূপে—যিনি অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে মানবজাতিকে রক্ষা করেন।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রী রামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। কিন্তু সেই সময় ছিল শরৎকাল। দেবীর পূজার প্রচলিত সময় বসন্ত হলেও শ্রী রামচন্দ্র বিশেষ প্রয়োজনে শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেন।
এই ঘটনাকেই বলা হয় অকাল বোধন। সেই থেকেই শরৎকালের দুর্গাপূজার সূচনা হয় এবং সময়ের সাথে সাথে শারদীয় দুর্গাপূজা সর্বাধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবুও বসন্তের সেই প্রাচীন পূজা—বাসন্তী পূজা—আজও ভক্তদের হৃদয়ে এক বিশেষ আবেগ ও ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে আছে।
বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে বাসন্তী পূজার গভীর শিকড় রয়েছে। গ্রামবাংলার বহু মন্দির, আশ্রম ও আখড়ায় আজও চৈত্র মাসে দেবী দুর্গার এই পূজা অনুষ্ঠিত হয় ভক্তি ও আনন্দঘন পরিবেশে।
চার দিনব্যাপী এই পূজায় অনুষ্ঠিত হয় দেবীর বোধন, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি, হোমযজ্ঞ, কীর্তন, ধর্মসভা ও প্রসাদ বিতরণ। ভোরের শঙ্খধ্বনি, ঢাকের তাল আর ভক্তদের সমবেত প্রার্থনায় পূজামণ্ডপে সৃষ্টি হয় এক অপার্থিব পরিবেশ।
বাসন্তী পূজার অন্যতম সৌন্দর্য হলো দেবীর বিশেষ সাজসজ্জা। দেবীকে সাধারণত বাসন্তী বা হলুদ রঙের শাড়ি ও অলঙ্কারে সাজানো হয়। গাঁদা ফুল, কৃষ্ণচূড়া ও নানা বসন্তের ফুল দিয়ে সাজানো হয় মন্দির ও পূজামণ্ডপ।
এই রঙ ও সাজসজ্জা বসন্তের প্রাণচাঞ্চল্য, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং নতুন জীবনের প্রতীক বহন করে।
বাসন্তী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি সনাতন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। যদিও বর্তমানে শারদীয় দুর্গাপূজাই সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে পরিচিত, তবুও বসন্তে দেবী দুর্গার আরাধনার এই প্রাচীন ঐতিহ্য আজও মানুষের হৃদয়ে অম্লান।
ভক্তদের বিশ্বাস—বসন্তের এই পবিত্র সময়ে দেবী বাসন্তী মা পৃথিবীতে শুভ শক্তির জাগরণ ঘটান, অশুভ শক্তিকে দূর করেন এবং মানুষের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনেন।
বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে, ফুলের সৌরভে আর ভক্তির আবেগে যখন দেবী দুর্গার আরাধনা ধ্বনিত হয়—তখনই অনুভূত হয় বাসন্তী মায়ের ঐশ্বরিক উপস্থিতি। যুগের পর যুগ ধরে এই পূজা সনাতন ধর্মের এক অনন্য ঐতিহ্য হয়ে মানুষের হৃদয়ে ভক্তি, আশা ও ভালোবাসার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।
মতামত