ভারতবর্ষে যুগে যুগে মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখাতে বহু সাধু-সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ত্রৈলঙ্গস্বামী ছিলেন এক অনন্য সাধক। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি প্রায় ২৮০ বছর পৃথিবীতে অবস্থান করেছিলেন এবং কঠোর তপস্যার মাধ্যমে এমন এক উচ্চস্তরের সাধনায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে জাগতিক সুখ-দুঃখ তাঁর ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারত না।
কথিত আছে, তীব্র শীতের মধ্যেও তিনি নগ্ন শরীরে বিচরণ করতেন এবং প্রচণ্ড গরমে উত্তপ্ত বালির ওপর শুয়ে থেকেও ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তাঁর এই অসাধারণ সহিষ্ণুতা ও আধ্যাত্মিক শক্তির জন্য ভক্তরা তাঁকে শিবের জীবন্ত রূপ বলে মনে করতেন।
ত্রৈলঙ্গস্বামীর জীবনকে ঘিরে নানা অলৌকিক ঘটনার কথাও প্রচলিত রয়েছে। একবার তিনি গঙ্গার প্রবল স্রোতে ভেসে ছিলেন। সেই সময় ভারনসী যাওয়ার পথে উজ্জয়িনীর এক মহারাজ নৌকায় করে যাচ্ছিলেন। স্বামিজীকে দেখে নৌকার সহচররা তাঁর অলৌকিক শক্তির কথা রাজাকে জানান। রাজা মনে মনে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যদি এই সাধক তাঁর নৌকায় ওঠেন। আশ্চর্যজনকভাবে, রাজা কিছু বলার আগেই ত্রৈলঙ্গস্বামী সেই ভাব বুঝে নিজেই নৌকায় উঠে আসেন।
নৌকায় বসে তিনি রাজার কোমরে ঝোলানো মণি-মুক্তা খচিত তলোয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। রাজা সম্মানবশত তলোয়ারটি তাঁর হাতে দিলে স্বামিজী সেটি গঙ্গায় নিক্ষেপ করেন। এতে রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং ডুবুরি নামানোর নির্দেশ দেন। কিছুক্ষণ পর ডুবুরিরা জল থেকে ঠিক একই রকমের দুটি তলোয়ার তুলে আনে।
স্বামিজী তখন রাজাকে বলেন—এই দুইটির মধ্যে কোনটি তাঁর, তা চিনে নিতে। রাজা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যান, কারণ তিনি নিজের তলোয়ারটি আলাদা করতে পারেননি। তখন ত্রৈলঙ্গস্বামী বলেন, “যে মানুষ নিজের জিনিসই চিনতে পারে না, সে আবার ‘আমার’ ‘আমার’ বলে এত অহংকার করে কেন?”
এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন—মানুষের অহংকারই তাকে সত্যজ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। দেহ, ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা সবই ক্ষণস্থায়ী; একদিন সবকিছু ফেলে মানুষকে চলে যেতে হয়। তাই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আত্মজ্ঞান ও ঈশ্বরচিন্তা।
ত্রৈলঙ্গস্বামীজীর আবির্ভাব তিথিতে ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধায় এই মহাসাধককে স্মরণ করেন। তাঁর ত্যাগ, সাধনা ও আধ্যাত্মিক বাণী আজও মানুষকে সত্য ও আত্মজ্ঞান অনুসন্ধানের পথে অনুপ্রাণিত করে।


মতামত