খুলনার পাইকগাছা উপজেলার অপহরণ থেকে উদ্ধার হওয়া কিশোরী সুচনা মন্ডলকে ঘিরে যে বাড়িতে স্বস্তি, আনন্দ আর স্বজনদের উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন শুধুই শোক, কান্না আর হাহাকার।
দীর্ঘ ১৮ দিন পর মেয়েকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছিলেন বাবা প্রশান্ত কুমার মন্ডল। কিন্তু মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে টানা পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত না-ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। আর বাবার নিথর দেহের সামনে এসে পায়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল অপহরণ থেকে উদ্ধার হওয়া মেয়ে সুচনা মন্ডল। হৃদয়বিদারক এই দৃশ্য এখন পাইকগাছাজুড়ে গভীর বেদনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
খুলনা জেলার পাইকগাছা থানার অপহরণ মামলায় অপহৃত কিশোরী সুচনা মন্ডলকে গত ১১ মার্চ ২০২৬ দিবাগত রাতে ঢাকার আশুলিয়া থানাধীন জিরাবো এলাকা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। একই অভিযানে মামলার প্রধান আসামি মান্না সরদারকে গ্রেফতার করা হয়। খুলনার পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমান, ডি-সার্কেল এসপি মো. আমির হামজা, পাইকগাছা থানা পুলিশ এবং আশুলিয়া থানা পুলিশের সমন্বিত সহযোগিতায় এই উদ্ধার অভিযান সফল হয়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মেয়েকে উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর বাবা প্রশান্ত কুমার মন্ডল, তার দুই ছোট ভাই এবং পাইকগাছা থানার পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে আশুলিয়া থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেন, যাতে তিনি নিজ হাতে মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু পথিমধ্যে ফেরিঘাটের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন প্রশান্ত কুমার মন্ডল। পরিস্থিতি বিবেচনায় তার এক ভাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি ভাড়া করা মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অপরদিকে তার আরেক ভাই পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আশুলিয়ার দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখেন।
কিন্তু বাড়ি ফেরার সেই পথই হয়ে ওঠে নির্মম নিয়তির ফাঁদ। সেদিন দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে তাদের বহনকারী মোটরসাইকেলটি সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনার পর মোটরসাইকেল চালক গুরুতর আহত প্রশান্ত কুমার মন্ডল ও তার ভাইকে রাস্তায় মুমূর্ষ অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাদেরকে সড়কে পড়ে থাকতে দেখে দ্রুত উদ্ধার করে যশোর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে প্রশান্ত কুমার মন্ডলের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ঢাকায় রেফার করেন।


ঢাকার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর টানা পাঁচ দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করেন প্রশান্ত কুমার মন্ডল। পরিবারের সদস্যরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশায় ছিলেন, হয়তো তিনি সুস্থ হয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন। কিন্তু সেই আশা পূরণ হলো না। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অপহৃত মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আগেই বাবার এই মৃত্যু তাদের জীবনে এক অপূরণীয় শোক বয়ে এনেছে।
ঘটনার আরও হৃদয়বিদারক দিক হলো, সুচনা মন্ডল তখনও পুলিশি হেফাজতে ছিল। পরিবারের অনুরোধ এবং মানবিক বিবেচনায় খুলনার ডি-সার্কেল এসপি মো. আমির হামজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে পাইকগাছা থানা পুলিশ প্রশাসন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সুচনা মন্ডলকে তার বাবার শেষকৃত্যের আগে বাড়িতে নিয়ে আসে, যাতে সে বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে পারে। বাড়িতে এনে বাবার নিথর দেহের সামনে দাঁড়াতেই ভেঙে পড়ে সুচনা। স্বজনদের উপস্থিতিতে বাবার পায়ে ধরে কান্নায় লুটিয়ে পড়ে সে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, পুরো বাড়ির পরিবেশ ছিল হৃদয়বিদারক। যে বাড়িতে মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে উৎসবের আবহ থাকার কথা ছিল, সেই বাড়িতে আজ শুধু কান্নার রোল। স্বজনদের আহাজারি, প্রতিবেশীদের চোখের জল আর সুচনার অসহায় কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অনেকে বলেন, “এমন নির্মম পরিণতি কেউ কল্পনাও করেনি। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার সুখবর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিবারের জীবনে গভীর শোকের কালো ছায়া নামিয়ে আনল।”

মতামত