স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় ১১০ বছর আগে জয়রামপুর গ্রামের এই প্রাচীন বটগাছকে দেবী সিদ্ধেশ্বরীর প্রতীক হিসেবে পূজা করার প্রচলন শুরু হয়। ধীরে ধীরে এই স্থানটি পরিচিতি পায় ‘সিদ্ধেশ্বরী কালীতলা’ নামে, আর সাধারণ মানুষের মুখে এটি হয়ে ওঠে ‘বউতলা’।
প্রথমদিকে এই পূজায় শুধু নববধূরাই অংশ নিতেন। নতুন জীবনের শুরুতে তারা পরিবারের সুখ-শান্তি ও মঙ্গল কামনায় এখানে এসে পূজা-অর্চনা করতেন। সময়ের পরিবর্তনে এখন এই আচার-অনুষ্ঠানে সব বয়সী নারীদেরই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়।
বুধবার ভোর থেকেই আশপাশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে শত শত নারী নতুন শাড়ি পরে, হাতে ডালি নিয়ে বটতলায় ভিড় করেন। ফল, ফুল, মিষ্টি ও নানা নৈবেদ্য দিয়ে তারা প্রার্থনা করেন পরিবারের সুখ-শান্তি, সন্তানের মঙ্গল এবং জীবনের সমৃদ্ধি কামনায়। দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে তাদের এই ভক্তিময় উপস্থিতি পুরো এলাকায় এক আবেগঘন ও পবিত্র পরিবেশ তৈরি করে।
পূজায় অংশ নিতে আসা নিপা বর্মন জানান, তারা গাছের গোড়ায় মাটি ও কড়ি দিয়ে প্রার্থনা করেন। পরিবারের সদস্য যতজন, ততবার সেই মাটি দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে—যা তাদের বিশ্বাসে মনের ইচ্ছা পূরণের প্রতীক।
অন্যদিকে শিখা রানী বলেন, ভোর থেকেই তারা এখানে উপস্থিত হয়ে শ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের কাছে তেল-পান অর্পণ করে পরিবারের সবার মঙ্গল কামনা করেন।
এই পূজাকে ঘিরেই কেন নাম হলো ‘বউ মেলা’—তা ব্যাখ্যা করেন পূজা আয়োজন কমিটির প্রধান নিলুৎপল রায়। তিনি জানান, শুরুতে শুধু নারীরাই অংশ নিতেন, বিশেষ করে নববধূদের উপস্থিতিই ছিল বেশি। জামাইদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা মূল আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন না। নারীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থেকেই ধীরে ধীরে এটি ‘বউ মেলা’ নামে পরিচিতি পায়।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরে বসেছে নানা ধরনের দোকান। রঙিন চুড়ি, ফিতা, মাটির খেলনা, মিষ্টি, পিঠা-পুলি ও বিভিন্ন খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সীরাই মেলায় এসে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। প্রতি বছর এই মেলাকে ঘিরে আত্মীয়-স্বজনের দেখা হয়, পুরোনো সম্পর্ক নতুন করে জেগে ওঠে।
ভক্তি, সংস্কৃতি আর আনন্দের এই মিলনমেলায় নতুন বছরকে শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরিয়ে তোলার প্রত্যাশা নিয়ে আগামী তিন দিন ধরে চলবে জয়রামপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’।
মতামত