রাধার পৈতৃক নিবাস পীরগঞ্জের জয়কুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক বিষাদময় পরিবেশ। জীর্ণ টিনের ঘর আর চাটাইয়ের বেড়া দেওয়া যে ঘরে রাধা থাকত, সেটি আজ শূন্য। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বাবা মহেন্দ্র নাথ কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে স্বামী মিঠুনকে নিয়ে রাধা টাকার জন্য এসেছিল। নিঃস্ব বাবা কিছুটা সময় চেয়ে মেয়েকে বিদায় দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই বিদায়ই যে শেষ বিদায় হবে তা তিনি কল্পনাও করেননি। বিয়ের পর থেকেই রাধার ওপর চলত অমানুষিক নির্যাতন, এমনকি তাকে না খাইয়েও রাখা হতো। বাবার কষ্টের কথা ভেবে শান্ত স্বভাবের মেয়েটি মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলেনি।
গত সোমবার সকালে শ্বশুরবাড়ি থেকে রাধার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। স্বামীর পরিবারের দাবি এটি আত্মহত্যা হলেও রাধার ভাই সুভাষ চন্দ্র রায় ও ভাবি মানতা রাণীর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাদের দাবি, রাধাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, পুলিশ লাশ ময়নাতদন্ত করার পর পরিবারের কাউকে না জানিয়েই তড়িঘড়ি করে লাশ সৎকার করে ফেলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। ভাই সুভাষের আক্ষেপ, তারা শেষবারের মতো বোনের মুখটুকুও দেখার সুযোগ পাননি।
এই ঘটনায় জয়কুর গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে এখন শোকের মাতম। এলাকাবাসী বলছেন, ৯ বছর বয়সে মাকে হারানো অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র মেয়েটি কোনোভাবেই আত্মহত্যা করতে পারে না। তাদের অভিযোগ, একটি গর্ভবতী মেয়েকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পর এখন আত্মহত্যার নাটক সাজানো হচ্ছে। অথচ এই অসহায় হিন্দু বাবা যখন পীরগঞ্জ থানায় মামলা করতে যান, তখন পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের এই রহস্যজনক নীরবতা ও মামলা গ্রহণে অনীহা সংখ্যালঘু পরিবারটিকে আরও বেশি দিশেহারা করে তুলেছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সুপার বেলাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে মামলা নিতে কোনো বাধা নেই। তবে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের এই গড়িমসি ও নিস্পৃহতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি যখন একটি জাতির ভবিষ্যত ও ধর্মের মর্যাদা ধূলিসাৎ করছে, তখন রাধা রানীর মতো অসহায় মেয়েদের খুনিরা পার পেয়ে যাবে কি না, সেই আশঙ্কায় প্রহর গুনছে ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দু সমাজ। তারা অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মতামত