কুমিল্লায় দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হয়েছিলেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী।
মেধাবী এই হিন্দু তরুণ কর্মকর্তার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবারে, আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে তার স্ত্রী উর্মী হীরা ও একমাত্র সন্তান।
পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাকরির বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ না হওয়ায় সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বুলেট বৈরাগীর পরিবার পেনশন বা গ্র্যাচুইটির মতো সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এছাড়া তার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি, ফলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী স্ত্রী উর্মী হীরার জন্য সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তবুও ব্যক্তিগত দৃঢ়তায় উর্মী হীরা তার এক বছরের সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে জানিয়েছেন, স্বামীর মতো হয়তো সব দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, কিন্তু চেষ্টা করবেন তাদের নিজের বাবা-মায়ের মতো আগলে রাখতে।
বুলেট বৈরাগীর জীবনের গল্পও অত্যন্ত সংগ্রামী। তার দিনমজুর বাবা নিজের সহায়-সম্বল, জমিজমা ও স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন।
মানুষের বাড়িতে শ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছেন সন্তানের ভবিষ্যৎ। সেই সন্তান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে মেধার প্রমাণ রেখে একের পর এক ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েও নিজের লক্ষ্যে অটল ছিলেন।
অবশেষে ৪১তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পদে সহকারী কাস্টমস কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবনে স্থিত হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাত্র ১ বছর ৩ মাস চাকরি করার পরই নির্মমভাবে ঝরে গেল তার জীবন। বিয়ের তিন বছরের মাথায় স্ত্রী ও এক বছরের সন্তানকে রেখে তাকে বিদায় নিতে হলো পৃথিবী থেকে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে বাসে করে কুমিল্লায় ফিরছিলেন বুলেট বৈরাগী।
পথিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়ায় তিনি কখন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড পার হয়েছেন তা বুঝতে পারেননি। এমনকি নিরাপদ কোটবাড়ী বিশ্বরোড এলাকাও অতিক্রম করে যায় বাসটি। পরে ঘুম ভেঙে গেলে বাসের হেলপার তাকে কুমিল্লার জাগুরঝুলি এলাকায় নামিয়ে দেয়, যা তুলনামূলকভাবে অনিরাপদ স্থান।
রাত ১টা ২৫ মিনিটে স্ত্রীর সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তিনি স্ত্রীকে বলেন, “ঘুমিয়ে পড়ো, আমার আসতে দেরি হবে।” এরপর আর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়নি।
বাস থেকে নামার পর তিনি জাঙ্গালিয়া যাওয়ার জন্য যানবাহন খুঁজছিলেন। এসময় একটি সিএনজি অটোরিকশায় থাকা ছিনতাইকারীরা তাকে লক্ষ্য করে। তারা গন্তব্য জানতে চাইলে বুলেট জানান, তিনি জাঙ্গালিয়ায় যাবেন। এরপর তাকে গাড়িতে তুলে নেয় দুর্বৃত্তরা।
পরে চলন্ত সিএনজি থেকে তার মোবাইল ফোন, ব্যাগ ও টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরদিন শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ী এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর একমাত্র ছেলে। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন এবং বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন।
তার মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, একটি স্বপ্নেরও অবসান হয়েছে। বৃদ্ধ বাবা-মা, তরুণী স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে পরিবারটির।
এ অবস্থায় স্থানীয়রা এবং সচেতন মহল ও নেটিজেনরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুলেট বৈরাগীর স্ত্রী উর্মী হীরাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাস্টমস বিভাগে একটি চাকরি প্রদান এবং পরিবারটির জন্য আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে তার এক বছরের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবারটির বেঁচে থাকার জন্য এখন রাষ্ট্রীয় সহায়তাই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মতামত