ওপার বাংলার রাজনীতির পটপরিবর্তন এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শনিবার যখন কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী, ঠিক তখনই এক সময়ের প্রতাপশালী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা যাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মেজাজে। দীর্ঘ শাসনের অবসানে নীলবাড়ির লড়াইয়ে পরাজয়ের পর এটিই হতে যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি। তবে কোনো রাজনৈতিক হুঙ্কার নয়, বরং কালীঘাটের নিজ বাসভবনের চত্বরে অনাড়ম্বর রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের মধ্য দিয়ে এই নতুন অধ্যায় শুরু করছেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না। একদিকে যখন সনাতনী সংস্কৃতির পুনরুত্থান ও পরিবর্তনের জোয়ারে শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ব্রিগেডে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে, তখন মমতার এই আয়োজনকে পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার এক ম্লান প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অতীতে ক্ষমতায় থাকাকালীন তৃণমূল যেভাবে জাঁকজমকপূর্ণভাবে সরকারি উদ্যোগে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করত, এবারের চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত। খোদ তৃণমূল নেতৃত্বও স্বীকার করে নিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের মতো সাড়ম্বর অনুষ্ঠানের কোনো সুযোগ বা সামর্থ্য দলের নেই। কালীঘাটের এই ঘরোয়া অনুষ্ঠানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলের হাতেগোনা কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জানা গেছে, অনুষ্ঠানে পরাজিত সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এবং রাজ্যসভার সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় সঙ্গীত পরিবেশন করবেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কর্মসূচির সময় নির্বাচন নিয়েও নানামুখী আলোচনা চলছে। ব্রিগেডে যখন নতুন সরকারের শপথের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্য পরিবর্তনের সঙ্কল্প নেওয়া হবে, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই কালীঘাটের চারুকলার আড়ালে নিজেদের গুটিয়ে রাখছে তৃণমূল শিবির। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, তাদের সমর্থিত কয়েকটি অরাজনৈতিক সংগঠনকে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের অনুমতি দেয়নি পুলিশ।
তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, বিপুল জনম্যান্ডেট হারিয়ে এখন সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করছে তারা। যেখানে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, সেখানে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘরোয়া আয়োজন কার্যত ক্ষমতার চাকা ঘুরে যাওয়ার এক করুণ প্রতিচ্ছবি হয়েই ফুটে উঠছে। শুভেন্দুর শপথে যখন হিন্দুত্ববাদী চেতনার জয়গান এবং উন্নয়নের নতুন শপথ ধ্বনিত হবে, তখন কালীঘাটের দেওয়ালের ভেতরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মূর্ছনা তৃণমূলের রাজনৈতিক বিদায়লগ্নেরই সুর হয়ে থাকবে কি না, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে দুই বাংলার রাজনৈতিক মহলে।
মতামত