সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত পরিস্থিতি এক জটিল ও উত্তেজনাকর রূপ ধারণ করেছে। ভারতের নয়াদিল্লিতে গত আটই জুন থেকে ১১ই জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে তথাকথিত 'পুশ-ইন' বা জোরপূর্বক কাউকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের security বাহিনীর মধ্যে মাঠ পর্যায়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সীমান্ত সংলগ্ন সাধারণ ও সংখ্যালঘু সনাতনী জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকারকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সম্প্রতি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্তে পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সংকট কেবল একটি প্রশাসনিক বিরোধ নয়, বরং তা সীমান্ত অঞ্চলের নিরপরাধ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর সীমান্তে প্রবীণ সনাতনী ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে ঘিরে বিএসএফ ও বিজিবির সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘ বাকবিতণ্ডা ও চরম উত্তেজনা সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লির শীর্ষ বৈঠকে সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এবং যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশ-ইন বন্ধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর পক্ষ থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও বলপ্রয়োগ বন্ধের ওপর জোর দিয়ে যৌথ টহল এবং নজরদারি বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন। News copied from- 'হিন্দুস নিউজ'

তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় সংকটের পরও সম্মেলন শেষে কোনো যৌথ ঘোষণা বা সাধারণ ঐকমত্যের প্রথাগত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। উভয় পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা বিবৃতি প্রদান করার ঘটনাটি এটাই নির্দেশ করে যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভেতরে সুর নরম হলেও মাঠ পর্যায়ের জটিলতা নিরসনে কার্যকর কোনো সমাধান অধরাই রয়ে গেছে। বৈঠকে পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশবিরোধী সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হলে, ভারত সরকার তাদের নীতি অনুযায়ী যেকোনো ধরণের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' পুনর্ব্যক্ত করে।
অপরদিকে বিএসএফের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা এবং অন্য নাগরিকদের অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি সামনে আনা হলে, বিজিবি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বিক মানবিক দিক বিবেচনা করে নিজস্ব অবস্থান তুলেধরে এবং ১৯৭৫ সালের সীমান্ত নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমে ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া বা অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে নিয়মাবলী মেনে চলার আহ্বান জানায়। মাদক ও চোরাচালান রোধে দুই পক্ষ একমত হলেও, সীমান্ত অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও সাধারণ নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষা এবং পুশ-ইনের মতো স্পর্শকাতর মানবিক সংকট নিরসনে আগামী দিনে আরও সংবেদনশীল ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
মতামত