২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও প্রবীণ রাজনীতিক, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ওপর চালানো বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা ও হত্যাচেষ্টা মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষিত হয়েছে। দীর্ঘ ২২ বছরের আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সিলেটের বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই বহু প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সরকারি দলীয় হুইপ জি কে গউছ এবং সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ৯ জন আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার মূল অপরাধী হাফিজ সৈয়দ নাঈম আহমেদ আরিফ ওরফে নিমুকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। সনাতনীদের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই রায়কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দিরাই বাজারের রাজনৈতিক সমাবেশে আকস্মিক গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, যেখানে তিনি অল্পের জন্য প্রাণরক্ষা পেলেও এক যুবলীগ কর্মী নিহত হন এবং ২৯ জন গুরুতর আহত হন। তৎকালীন সময়ে দিরাই থানার এসআই হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে মামলা করার পর দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই মামলাকে ভিন্ন খাতে মোড় নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জিকে গৌছসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') মামলায় মোট ১২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এই রায় প্রদান করেন। আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন জানান, মামলায় মোট ১৩ জন অভিযুক্তের মধ্যে ৩ জনের আগেই অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে এবং বাকি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছেন।

রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং খালাসপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিনের আইনি হয়রানি ও কারাবরণের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী একে একটি চরম ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা হিসেবে অভিহিত করে বলেন যে, তারা দীর্ঘদিন অন্যায়ভাবে কারাবরণ করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। সরকারি দলীয় হুইপ জি কে গউছ তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, সাড়ে ২৬ মাস তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন এবং দেশে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণেই আজ আদালত স্বাধীন ও সত্যের ভিত্তিতে এই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। একই সাথে তিনি নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীসহ রাজনৈতিক কারণে নির্যাতিত সকল মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানান। সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ও সিলেটের এই গ্রেনেড মামলাসহ একাধিক মামলায় জড়ানো হয়েছিল। অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত হয়েছে।
মতামত