চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে একজন সন্তানের হাত ধরে। সেই স্বপ্ন ছিল গ্রামের অসহায় মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করে চলেছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সীমান্ত ওয়াদ্দার।
আশির দশকে সারোয়াতলী গ্রামে চিকিৎসাসেবার অবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অভাবে অধিকাংশ মানুষ নির্ভর করতেন হাতুড়ে চিকিৎসকদের ওপর। এমন বাস্তবতায় গ্রামের সংস্কৃতিমনা ও সমাজসচেতন ব্যক্তি সাধন ওয়াদ্দার প্রায়ই আক্ষেপ করতেন—একদিন যদি গ্রামের মানুষ সহজে চিকিৎসাসেবা পেত!
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর সন্তানদের কেউ একজন চিকিৎসক হয়ে গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়াবে। সেই স্বপ্নই পরবর্তীকালে ধারণ করেন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র সীমান্ত ওয়াদ্দার।
সারোয়াতলীর পদ্মপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় সীমান্তের। পরে তিনি চট্টগ্রাম শহরের কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৯১ সালে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে এইচএসসি পাস করেন।
পরিবারের সদস্যদের তথ্যমতে, এইচএসসি পরীক্ষার প্রায় দেড় মাস আগে তাঁর বাবা সাধন ওয়াদ্দার মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে ছেলের হাত ধরে গ্রামের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবার স্বপ্নের কথা তিনি ব্যক্ত করেছিলেন। সেই অঙ্গীকারই আজও নিজের জীবনের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে ধারণ করে চলেছেন ডা. সীমান্ত ওয়াদ্দার।
১৯৯৩–৯৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। চিকিৎসা পেশাকে তিনি কেবল জীবিকা নয়, মানুষের সেবার একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর ২০০২ সালে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
২০০৬ সালের বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের মাধ্যমে তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। পরে তিনি বোয়ালখালীতে ব্যক্তিগত চিকিৎসাসেবা শুরু করেন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজ গ্রামের প্রতি তাঁর টান অটুট। গ্রামের বাড়িতে গেলে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের বিনা ফিতে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন বলে পরিবার ও এলাকাবাসী জানিয়েছেন। শুধু সরাসরি নয়, গ্রামের কেউ ফোনে চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শ চাইলে যথাসাধ্য সহযোগিতা করারও চেষ্টা করেন তিনি।
স্থানীয়দের মতে, আধুনিক সময়ে যখন চিকিৎসাসেবা অনেক ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিকতার অভিযোগে সমালোচিত, তখন ডা. সীমান্ত ওয়াদ্দারের এই উদ্যোগ তাঁর বাবার মানবিক আদর্শকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে। শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ—এই দুই মূল্যবোধের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে তাঁর পথচলা।
গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, একজন চিকিৎসকের প্রকৃত সাফল্য কেবল পেশাগত অর্জনে নয়; মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জনেও। সেই অর্থে ডা. সীমান্ত ওয়াদ্দার তাঁদের কাছে শুধু একজন চিকিৎসক নন, বরং প্রয়াত বাবার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা এক মানবিক মুখ।
মতামত