হিন্দুস নিউজ

হারিয়ে গেছে উলুধ্বনি, ভেঙে ফেলা হলো মণ্ডপ; দাপুনিয়ায় চরম অস্তিত্ব সংকটে অবশিষ্ট হিন্দু পরিবার


| প্রিন্ট সংস্করণ

হারিয়ে গেছে উলুধ্বনি, ভেঙে ফেলা হলো মণ্ডপ; দাপুনিয়ায় চরম অস্তিত্ব সংকটে অবশিষ্ট হিন্দু পরিবার
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
বাঙালি সনাতনীদের আদি পরিচয়, ভূমি এবং অস্তিত্ব সংকটের এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে ময়মনসিংহের দাপুনিয়া অঞ্চলে। মানুষের পরিচয় গড়ে ওঠে তার দাদার নাম, বাবার নাম, গ্রামের নাম, এলাকার নাম কিংবা দেশের নাম দিয়ে। এই নামগুলোর মধ্য দিয়েই মানুষ একে অপরকে চেনে, একসঙ্গে পথ চলে। তেমনই এক সময় এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যের নাম ছিল 'চাড়ালপাড়া বাজার'। মূলত চাড়াল সম্প্রদায়ের বসবাসের কারণেই হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলে তৎকালীন সময়ে বাজারটির এই নামকরণ করেছিলেন। এই অন্ত্যজ ও শ্রমজীবী হিন্দু সম্প্রদায়টি একসময় এ অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

 এলাকায় পশুপাখি মারা গেলে চামড়া ছড়ানো, শ্মশানে সৎকার, কবর রক্ষণাবেক্ষণ, ধনীদের গৃহস্থালি কাজ কিংবা গবাদি পশুর প্রজনন সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বগুলো তারাই পালন করত। অত্যন্ত দরিদ্র ও নিম্নশ্রেণির হওয়ায় তাদের সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও, স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের মুসলিম ও উচ্চবর্ণের শিশুদের সাথে তারা পরম সুহৃদয়তায় খেলাধুলা করত। সন্ধ্যার চাড়ালপাড়া বাজার থেকে ফেরার পথে বাতাসে ভেসে আসত সনাতনী মা-বোনদের ভক্তিপূর্ণ উলুধ্বনি, যা আজ কেবলই অতীত স্মৃতি। ​(News copied from- 'HINDUS NEWS')

​কালের বিবর্তনে ও সুক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনে চাড়ালপাড়ার সেই নাম পরিবর্তন করে প্রথমে রাখা হয়েছিল 'সরকারি পুকুরপাড় বাজার'। মূলত এই নামকরণের আড়ালেই চাড়াল সম্প্রদায়কে ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত প্রবণতা শুরু হয়। প্রবীণদের মুখে জানা যায়, একসময় পুরো গ্রাম জুড়ে চাড়ালদের ব্যাপক বসবাস ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে অনেকেই নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এরপর যে গুটিকয়েক পরিবার অবশিষ্ট ছিল, তাদের ওপর নেমে আসে নানামুখী অত্যাচার ও ভূমি দখলের নীরব উৎসব। শুধুমাত্র তাদের স্থাবর সম্পত্তি গ্রাস করার হীন উদ্দেশ্যে চলা এই নির্যাতনের জেরে আজ পুরো এলাকায় সম্ভবত একজন চাড়ালও বেঁচে নেই। দুঃখজনকভাবে, সরকারি পুকুরপাড় বাজার নাম দেওয়ার কয়েক বছর পর আবারও সেই বাজারের নাম পরিবর্তন করে বর্তমান রাখা হয়েছে 'মধ্যদাপুনিয়া বাজার', যা প্রকারান্তরে আদি সনাতনীদের অস্তিত্বের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলারই নামান্তর।

​দাপুনিয়া যোগীপাড়া ও পাঁচ কাহনীয়াসহ বেশ কয়েকটি সনাতন প্রধান এলাকা থেকে আজ হিন্দুরা ধীরে ধীরে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। বর্তমানে যে গুটিকয়েক পরিবার কোনোমতে টিকে আছে, তারা চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজেদের ধর্মীয় পূজাপার্বণ পালন করে অতি নীরবে, যা একপ্রকার গোপন বন্দিদশার শামিল। বাইরে থেকে কেউ এলে বোঝার উপায় থাকে না যে সেখানে কোনো পূজামণ্ডপ রয়েছে। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত হেনে গত কয়েকদিন আগে সেই মণ্ডপটিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই দাপুনিয়ার ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপটি ভাঙার পর লোকদেখানো পরিদর্শনে গিয়েছিলেন পাশের ঘাগড়া ইউনিয়নের এক জামায়াত নেতা। অথচ স্বাধীন দেশে সনাতনীদের এই চরম বিপদে আমরা মন্ত্রী, এমপি ও বহু বড় বড় প্রশাসক পেলেও, ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকেই পাওয়া যায়নি। দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জানমাল ও অধিকার রক্ষায় জনপ্রতিনিধিদের এই চরম উদাসীনতা ও জবাবদিহিতার অভাব প্রমাণ করে যে, শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশে প্রতি এক বছর পর পর জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হারিয়ে গেছে উলুধ্বনি, ভেঙে ফেলা হলো মণ্ডপ; দাপুনিয়ায় চরম অস্তিত্ব সংকটে অবশিষ্ট হিন্দু পরিবার

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬

featured Image
বাঙালি সনাতনীদের আদি পরিচয়, ভূমি এবং অস্তিত্ব সংকটের এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে ময়মনসিংহের দাপুনিয়া অঞ্চলে। মানুষের পরিচয় গড়ে ওঠে তার দাদার নাম, বাবার নাম, গ্রামের নাম, এলাকার নাম কিংবা দেশের নাম দিয়ে। এই নামগুলোর মধ্য দিয়েই মানুষ একে অপরকে চেনে, একসঙ্গে পথ চলে। তেমনই এক সময় এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যের নাম ছিল 'চাড়ালপাড়া বাজার'। মূলত চাড়াল সম্প্রদায়ের বসবাসের কারণেই হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলে তৎকালীন সময়ে বাজারটির এই নামকরণ করেছিলেন। এই অন্ত্যজ ও শ্রমজীবী হিন্দু সম্প্রদায়টি একসময় এ অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

 এলাকায় পশুপাখি মারা গেলে চামড়া ছড়ানো, শ্মশানে সৎকার, কবর রক্ষণাবেক্ষণ, ধনীদের গৃহস্থালি কাজ কিংবা গবাদি পশুর প্রজনন সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বগুলো তারাই পালন করত। অত্যন্ত দরিদ্র ও নিম্নশ্রেণির হওয়ায় তাদের সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও, স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের মুসলিম ও উচ্চবর্ণের শিশুদের সাথে তারা পরম সুহৃদয়তায় খেলাধুলা করত। সন্ধ্যার চাড়ালপাড়া বাজার থেকে ফেরার পথে বাতাসে ভেসে আসত সনাতনী মা-বোনদের ভক্তিপূর্ণ উলুধ্বনি, যা আজ কেবলই অতীত স্মৃতি। ​(News copied from- 'HINDUS NEWS')

​কালের বিবর্তনে ও সুক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনে চাড়ালপাড়ার সেই নাম পরিবর্তন করে প্রথমে রাখা হয়েছিল 'সরকারি পুকুরপাড় বাজার'। মূলত এই নামকরণের আড়ালেই চাড়াল সম্প্রদায়কে ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত প্রবণতা শুরু হয়। প্রবীণদের মুখে জানা যায়, একসময় পুরো গ্রাম জুড়ে চাড়ালদের ব্যাপক বসবাস ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে অনেকেই নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এরপর যে গুটিকয়েক পরিবার অবশিষ্ট ছিল, তাদের ওপর নেমে আসে নানামুখী অত্যাচার ও ভূমি দখলের নীরব উৎসব। শুধুমাত্র তাদের স্থাবর সম্পত্তি গ্রাস করার হীন উদ্দেশ্যে চলা এই নির্যাতনের জেরে আজ পুরো এলাকায় সম্ভবত একজন চাড়ালও বেঁচে নেই। দুঃখজনকভাবে, সরকারি পুকুরপাড় বাজার নাম দেওয়ার কয়েক বছর পর আবারও সেই বাজারের নাম পরিবর্তন করে বর্তমান রাখা হয়েছে 'মধ্যদাপুনিয়া বাজার', যা প্রকারান্তরে আদি সনাতনীদের অস্তিত্বের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলারই নামান্তর।

​দাপুনিয়া যোগীপাড়া ও পাঁচ কাহনীয়াসহ বেশ কয়েকটি সনাতন প্রধান এলাকা থেকে আজ হিন্দুরা ধীরে ধীরে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। বর্তমানে যে গুটিকয়েক পরিবার কোনোমতে টিকে আছে, তারা চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজেদের ধর্মীয় পূজাপার্বণ পালন করে অতি নীরবে, যা একপ্রকার গোপন বন্দিদশার শামিল। বাইরে থেকে কেউ এলে বোঝার উপায় থাকে না যে সেখানে কোনো পূজামণ্ডপ রয়েছে। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত হেনে গত কয়েকদিন আগে সেই মণ্ডপটিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই দাপুনিয়ার ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপটি ভাঙার পর লোকদেখানো পরিদর্শনে গিয়েছিলেন পাশের ঘাগড়া ইউনিয়নের এক জামায়াত নেতা। অথচ স্বাধীন দেশে সনাতনীদের এই চরম বিপদে আমরা মন্ত্রী, এমপি ও বহু বড় বড় প্রশাসক পেলেও, ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকেই পাওয়া যায়নি। দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জানমাল ও অধিকার রক্ষায় জনপ্রতিনিধিদের এই চরম উদাসীনতা ও জবাবদিহিতার অভাব প্রমাণ করে যে, শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশে প্রতি এক বছর পর পর জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
হারিয়ে গেছে উলুধ্বনি, ভেঙে ফেলা হলো মণ্ডপ; দাপুনিয়ায় চরম অস্তিত্ব সংকটে অবশিষ্ট হিন্দু পরিবার
0:00 0:00
1.0x