ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫৩তম শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের উদ্যোগে দিনব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল শ্রীকৃষ্ণের বিহিত পূজা, আলোচনা সভা, প্রসাদ বিতরণ এবং বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। পরে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা মূল জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন।
শুক্রবার সকালে শ্রী শ্রী রামসীতা মন্দিরে সকাল ৭টায় শ্রীকৃষ্ণের বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। পরে দুপুর ১টায় ভক্ত ও উপস্থিতদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। বিকেল ৩টায় শ্রী শ্রী রমনা কালী মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শোভাযাত্রা বের হয়ে পলাশীর মোড়ে মূল শোভাযাত্রায় যোগ দেয় বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের নেতাকর্মীরা। এরপর মূল শোভাযাত্রার সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি ভিক্টোরিয়া পার্কে গিয়ে শেষ হয়।
সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সভাপতি অ্যাডভোকেট দীনবন্ধু রায়। সভায় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট প্রদীপ কুমার পাল, মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, সহসভাপতি নিতাই দে সরকার ও দুলাল চন্দ্র মণ্ডল, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রতীভা বাকচী, হিন্দু যুব মহাজোটের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মৃণাল কান্তি মধু, সাধারণ সম্পাদক সুজন গাইন, অর্থ সম্পাদক মাধব মিত্র, ছাত্র মহাজোটের সভাপতি সজিব কুণ্ডু, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাণীব্রত সাহা, দপ্তর সম্পাদক সজিব দাস, গণমাধ্যম বিষয়ক সম্পাদক শুভজিৎ চক্রবর্তী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব নূপুর বসাক, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক অপু রায়, সবুজ দত্ত ও বিষ্ণু বর্মনসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
আলোচনা সভায় বক্তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবন, কর্ম ও দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই শ্রীকৃষ্ণের জীবনাদর্শের অন্যতম শিক্ষা। সেই আদর্শকে ধারণ করে দেশের জনগণের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তাঁরা।
সভায় বক্তারা দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের দাবি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে নির্যাতন বন্ধ, বৈষম্য দূর এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে হিন্দু সম্প্রদায় এখনও বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
বক্তারা জাতীয় সংসদে হিন্দু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের দাবি, জনসংখ্যার অনুপাতে জাতীয় সংসদে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তা অত্যন্ত সীমিত। তাঁদের ভাষ্য, কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব না থাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অধিকার যথাযথভাবে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ হলেও বর্তমানে সেই অনুপাত অনেক কমে এসেছে। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশ দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছে বলেও তাঁরা দাবি করেন। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা আরও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা।
দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, হুমকি, জমি দখল, প্রতিমা ভাঙচুর, দেশত্যাগে বাধ্য করা, কিশোরী অপহরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, চুরি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর থাকার পরও এসব অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন ও হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
একই সঙ্গে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও দেশত্যাগ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জাতীয় সংসদসহ রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের নেতারা।
বক্তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত আসন এবং পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানান। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা গেলে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
মতামত