হিন্দুস নিউজ

রাজধানী ঢাকায় আন্দোলনের নামে যাত্রী জিম্মি: ভোগান্তির চরম মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ


| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানী ঢাকায় আন্দোলনের নামে যাত্রী জিম্মি: ভোগান্তির চরম মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

ঢাকা—একটি শহর, যেখানে স্বাভাবিক দিনেও হাঁটার গতি অনেক সময় যানবাহনের চেয়ে বেশি। এই শহরেই যখন আন্দোলনের নামে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করা হয়, তখন তা আর প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রূপ নেয় লাখো সাধারণ যাত্রীর জীবনের ওপর এক নির্মম চাপ হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক পেশাজীবী গোষ্ঠীর আন্দোলনে ঢাকার মানুষ কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে।

দেশি-বিদেশি বহু মানুষের কাছেই ঢাকা পরিচিত ভয়াবহ যানজটের শহর হিসেবে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, অন্তত সাড়ে তিন কোটি মানুষ এই শহরের যানজটের ভুক্তভোগী। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাফিক পুলিশ গড় গতি বৃদ্ধির দাবি করেছে, বাস্তব অভিজ্ঞতায় সেই দাবি নিয়ে জনমনে প্রবল সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থমূল্যে এর পরিমাণ দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা, যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল ক্ষতির বোঝা বহন করছেন মূলত সাধারণ মানুষ—যাঁদের অধিকাংশেরই কোনো আন্দোলনের দাবিদাওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই।

Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) সংস্কারের দাবিতে একাংশ মুঠোফোন ব্যবসায়ী পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকার সড়কে নেমে পড়েন। এর আগে তাঁদের একটি অংশ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের ভবনে হামলার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এনইআইআর চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল অবৈধভাবে পাচার হওয়া মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ এই উদ্যোগকে নিজেদের আর্থিক স্বার্থের জন্য হুমকি মনে করে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ রাজপথকে বেছে নেয় চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধভাবে আমদানি হওয়া মোবাইল ফোন শুধু রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতিই করে না, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে নজরদারি, অপরাধ বা নিরাপত্তা বিঘ্নের আশঙ্কা থেকেই যায়। তা সত্ত্বেও, আন্দোলনের নামে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রোববার রাজধানীর ফার্মগেট, শাহবাগ, সার্ক ফোয়ারাসহ একাধিক এলাকায় একযোগে বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ হয়। কোথাও সহপাঠী হত্যার বিচার, কোথাও রাজনৈতিক হত্যার প্রতিবাদ, আবার কোথাও পেশাগত দাবিতে আন্দোলন। এর মধ্যেই মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ ঘটে। পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দেয়, যা মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক আচরণের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

তবে সহিংস দমন-পীড়নের নিন্দা জানালেও একটি বিষয় স্পষ্ট—রাজধানীবাসীকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি কোনো টেকসই বা গণতান্ত্রিক সমাধান আনতে পারে না। ঢাকার সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে এসব পেশাজীবী গোষ্ঠীর অধিকাংশ দাবির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। তবু প্রতিবার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় তাঁদেরই—সময়, কর্মজীবন, মানসিক স্বাস্থ্যের বিনিময়ে।

বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল রাজধানীর সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার চিত্র আরও করুণ হয়ে ওঠে। টমটম ট্রাফিক ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী, ম্যানিলা, জাকার্তা, নয়াদিল্লি কিংবা কায়রোর গড় যানগতিও ঢাকার চেয়ে অনেক ভালো। এমন বাস্তবতায় পরিকল্পিত সড়ক অবরোধ এই শহরকে কার্যত অচল করে দেয়।

নাগরিক সমাজের মতে, প্রতিবাদ ও আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও তার সীমা থাকা জরুরি। আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হলে তা জনসমর্থন হারায় এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। ঢাকার মতো একটি ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত শহরে এই প্রবণতা বন্ধ না হলে, সাড়ে তিন কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে—এমন আশঙ্কাই এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


রাজধানী ঢাকায় আন্দোলনের নামে যাত্রী জিম্মি: ভোগান্তির চরম মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

ঢাকা—একটি শহর, যেখানে স্বাভাবিক দিনেও হাঁটার গতি অনেক সময় যানবাহনের চেয়ে বেশি। এই শহরেই যখন আন্দোলনের নামে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করা হয়, তখন তা আর প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রূপ নেয় লাখো সাধারণ যাত্রীর জীবনের ওপর এক নির্মম চাপ হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক পেশাজীবী গোষ্ঠীর আন্দোলনে ঢাকার মানুষ কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে।

দেশি-বিদেশি বহু মানুষের কাছেই ঢাকা পরিচিত ভয়াবহ যানজটের শহর হিসেবে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, অন্তত সাড়ে তিন কোটি মানুষ এই শহরের যানজটের ভুক্তভোগী। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাফিক পুলিশ গড় গতি বৃদ্ধির দাবি করেছে, বাস্তব অভিজ্ঞতায় সেই দাবি নিয়ে জনমনে প্রবল সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থমূল্যে এর পরিমাণ দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা, যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল ক্ষতির বোঝা বহন করছেন মূলত সাধারণ মানুষ—যাঁদের অধিকাংশেরই কোনো আন্দোলনের দাবিদাওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) সংস্কারের দাবিতে একাংশ মুঠোফোন ব্যবসায়ী পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকার সড়কে নেমে পড়েন। এর আগে তাঁদের একটি অংশ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের ভবনে হামলার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এনইআইআর চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল অবৈধভাবে পাচার হওয়া মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ এই উদ্যোগকে নিজেদের আর্থিক স্বার্থের জন্য হুমকি মনে করে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ রাজপথকে বেছে নেয় চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধভাবে আমদানি হওয়া মোবাইল ফোন শুধু রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতিই করে না, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে নজরদারি, অপরাধ বা নিরাপত্তা বিঘ্নের আশঙ্কা থেকেই যায়। তা সত্ত্বেও, আন্দোলনের নামে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রোববার রাজধানীর ফার্মগেট, শাহবাগ, সার্ক ফোয়ারাসহ একাধিক এলাকায় একযোগে বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ হয়। কোথাও সহপাঠী হত্যার বিচার, কোথাও রাজনৈতিক হত্যার প্রতিবাদ, আবার কোথাও পেশাগত দাবিতে আন্দোলন। এর মধ্যেই মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ ঘটে। পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দেয়, যা মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক আচরণের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

তবে সহিংস দমন-পীড়নের নিন্দা জানালেও একটি বিষয় স্পষ্ট—রাজধানীবাসীকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি কোনো টেকসই বা গণতান্ত্রিক সমাধান আনতে পারে না। ঢাকার সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে এসব পেশাজীবী গোষ্ঠীর অধিকাংশ দাবির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। তবু প্রতিবার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় তাঁদেরই—সময়, কর্মজীবন, মানসিক স্বাস্থ্যের বিনিময়ে।

বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল রাজধানীর সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার চিত্র আরও করুণ হয়ে ওঠে। টমটম ট্রাফিক ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী, ম্যানিলা, জাকার্তা, নয়াদিল্লি কিংবা কায়রোর গড় যানগতিও ঢাকার চেয়ে অনেক ভালো। এমন বাস্তবতায় পরিকল্পিত সড়ক অবরোধ এই শহরকে কার্যত অচল করে দেয়।

নাগরিক সমাজের মতে, প্রতিবাদ ও আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও তার সীমা থাকা জরুরি। আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হলে তা জনসমর্থন হারায় এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। ঢাকার মতো একটি ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত শহরে এই প্রবণতা বন্ধ না হলে, সাড়ে তিন কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে—এমন আশঙ্কাই এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
রাজধানী ঢাকায় আন্দোলনের নামে যাত্রী জিম্মি: ভোগান্তির চরম মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ
0:00 0:00
1.0x