শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা প্রস্তুতি। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে পূজার আনুষ্ঠানিকতা—সবকিছু নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকরা। এরই মধ্যে ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার সপ্তমী তিথি নিয়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। কারণ, এবারের সপ্তমী ১৭ অক্টোবর শনিবার ও ১৮ অক্টোবর রবিবার—দুই দিনকে ঘিরে আলোচনা হচ্ছে।
সাধারণত দুর্গাপূজার সপ্তমী একটি দিনেই পালিত হতে দেখা যায়। কিন্তু চন্দ্র-সূর্যের অবস্থান ও তিথির স্থায়িত্বের কারণে কোনো কোনো বছর একটি তিথি পরপর দুই সূর্যোদয়কে স্পর্শ করতে পারে। তখন পঞ্জিকা অনুসারে একই তিথি দুই দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়। ২০২৬ সালের সপ্তমী নিয়েও এমন তিথি-গণনার বিষয় সামনে এসেছে।
হিন্দু পঞ্জিকায় দিনের হিসাব শুধু ইংরেজি ক্যালেন্ডারের তারিখের ওপর নির্ভরশীল নয়। এখানে চন্দ্র ও সূর্যের পারস্পরিক কৌণিক দূরত্বের ভিত্তিতে তিথি নির্ধারণ করা হয়। ফলে একটি তিথির দৈর্ঘ্য সবসময় ২৪ ঘণ্টা হয় না।
কখনো কোনো তিথি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, আবার কখনো তা ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলতে পারে। কোনো তিথি যদি এমনভাবে অবস্থান করে যে সেটি পরপর দুই দিনের সূর্যোদয়ের সময় বিদ্যমান থাকে, তখন পঞ্জিকা অনুসারে দুই দিনেই সেই তিথির উপস্থিতি দেখা যায়।
এই কারণেই কোনো কোনো বছরে সপ্তমী, অষ্টমী কিংবা অন্য তিথি নিয়ে একাধিক দিনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। মূল বিষয় হলো—কোন দিনে সূর্যোদয়ের সময় সংশ্লিষ্ট তিথি রয়েছে এবং পূজার নির্দিষ্ট আচার কোন সময়ে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।
২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় সপ্তমী তিথির সময়কাল দুইটি সূর্যোদয়কে স্পর্শ করছে—এমন পঞ্জিকাগত হিসাবের কারণেই ১৭ ও ১৮ অক্টোবরকে কেন্দ্র করে সপ্তমী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহৃত পঞ্জিকা, গণনাপদ্ধতি এবং স্থানীয় সময়ের পার্থক্যের কারণে পূজার নির্দিষ্ট আচার পালনের সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তাই সপ্তমীর পূজা, নবপত্রিকা প্রবেশ, অঞ্জলি বা অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার সঠিক সময় জানতে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রচলিত পঞ্জিকা ও পুরোহিতের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠীর পরেই আসে সপ্তমী। এদিন থেকেই দুর্গোৎসবের পূজার্চনা আরও আনুষ্ঠানিক ও ব্যাপক হয়ে ওঠে। বিভিন্ন মণ্ডপে সপ্তমীর সকালে বিশেষ ধর্মীয় আচার পালন করা হয়।
দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন। কলাগাছসহ নয় ধরনের উদ্ভিদকে নির্দিষ্ট বিধি অনুসারে একত্র করে নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। অনেক অঞ্চলে এটিকে প্রচলিতভাবে ‘কলাবউ’ নামেও অভিহিত করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট মন্ত্র ও আচার অনুসারে তা পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়।
সপ্তমীর পূজায় দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি বিভিন্ন উপাচার, মন্ত্রপাঠ, চণ্ডীপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি ও ভোগ নিবেদনের আয়োজন থাকে। ফলে ধর্মীয়ভাবে সপ্তমীর গুরুত্ব বিশেষ।
দুই দিন সপ্তমী মানেই কি দুই দিন একইভাবে পূজা?
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো তিথি দুইটি সূর্যোদয়কে স্পর্শ করলেই যে প্রতিটি পূজার আচার দুই দিন সমানভাবে পুনরাবৃত্তি হবে—এমন নয়।
কোন আচার কোন দিনে সম্পন্ন হবে, তা নির্ভর করে তিথির প্রকৃত সময়কাল, সূর্যোদয়ের সময় এবং সংশ্লিষ্ট পঞ্জিকার বিধানের ওপর। বিশেষ করে নবপত্রিকা, পূজার মূল সংকল্প, অঞ্জলি ও অন্যান্য আচার নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়।
তাই শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ দেখে সপ্তমীর পূজার সময় নির্ধারণ না করে স্থানীয় পূজা কমিটি ও পুরোহিতের দেওয়া সময়সূচি অনুসরণ করাই যথাযথ।
সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে দুর্গাপূজা শুধু উৎসব নয়; এটি শক্তির আরাধনা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা এবং আত্মশুদ্ধির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
সপ্তমীর আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আরাধনা আরও বিস্তৃত রূপ নেয়। ভক্তরা উপবাস, পূজা, অঞ্জলি, নামসংকীর্তন, চণ্ডীপাঠ ও প্রার্থনার মাধ্যমে দেবীর কৃপা কামনা করেন।
তবে ‘দুই দিন সপ্তমী হওয়ায় দেবীর আশীর্বাদ দ্বিগুণ হবে’—এ ধরনের বক্তব্যকে ধর্মীয় বিশ্বাস বা লোকাচার হিসেবে দেখা উচিত; এটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বা পঞ্জিকাগত নিয়মের সরাসরি ফল নয়।
দুর্গাপূজার তিথি নির্ধারণে ইংরেজি তারিখের চেয়ে পঞ্জিকায় উল্লেখিত তিথি ও পূজার নির্দিষ্ট সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই কারণে কোনো বছর একটি তিথি দুই দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, আবার কোনো তিথি একদিনের সূর্যোদয়ে না-ও থাকতে পারে।
তাই ২০২৬ সালের সপ্তমী নিয়ে যে দুই দিনের আলোচনা চলছে, তার পেছনে মূল বিষয় হলো তিথির সময়কাল ও সূর্যোদয়ভিত্তিক পঞ্জিকা গণনা। পূজার আচার পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্বীকৃত পঞ্জিকা ও পুরোহিতের নির্দেশনাই অনুসরণ করা উচিত।
শারদীয় দুর্গোৎসবের সপ্তমী তাই শুধু একটি তারিখ নয়—এটি তিথি, আচার, বিশ্বাস ও দীর্ঘদিনের সনাতন ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। দেবীর আরাধনায় মুখর হয়ে উঠবে মণ্ডপগুলো, আর ভক্তদের প্রার্থনায় ধ্বনিত হবে একটাই আকাঙ্ক্ষা—অশুভের বিনাশ, শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা এবং সবার মঙ্গল।
মতামত