শিক্ষা অর্জনের যে কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই, তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৭৬ বছর বয়সী শোভা মল্লিক। চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিদ্যার্থী বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৬’-এ অংশ নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। শুধু শোভা মল্লিক নন, ষাটোর্ধ্ব আরও কয়েকজন প্রবীণ পরীক্ষার্থীও অংশ নিয়েছেন এ পরীক্ষায়। শুক্রবার (২ অক্টোবর) উপজেলার ছয়টি কেন্দ্রে একযোগে অনুষ্ঠিত এ বৃত্তি পরীক্ষায় আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ২ হাজার ৫৮৭ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, মীরসরাই উপজেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ পরীক্ষায় উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অংশ নেন। পরীক্ষার জন্য মীরসরাই উপজেলার ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। কেন্দ্রগুলো হলো মিঠাছরা উচ্চ বিদ্যালয়, মীরসরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, জোরারগঞ্জ বৌদ্ধ উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারহাট নজরআলী রুপজান উচ্চ বিদ্যালয়, বারৈয়ারহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং করেরহাট কামিনী মজুমদার উচ্চ বিদ্যালয়।
আয়োজকদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ‘ক’ ও ‘খ’ বিভাগে অংশগ্রহণ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী পরীক্ষার্থীদের জন্য রাখা হয় ‘গ’ বিভাগ। এই বিভাগে প্রবীণদের অংশগ্রহণ এবারের বৃত্তি পরীক্ষাকে বিশেষভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ৭৬ বছর বয়সী শোভা মল্লিকের অংশগ্রহণ ছিল অন্যতম আকর্ষণ। আয়োজকদের দাবি, তিনি এবারের পরীক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ বয়সী পরীক্ষার্থী।
শোভা মল্লিক ছাড়াও প্রবীণ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৪ বছর বয়সী ঝুনু দত্ত ও মঞ্জু দাস, ৬২ বছর বয়সী চন্দনা দত্ত এবং ৬১ বছর বয়সী বুকুল দে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। জীবনের প্রবীণ পর্যায়েও তাঁদের এ ধরনের জ্ঞানচর্চামূলক আয়োজনে অংশগ্রহণ উপস্থিত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করে। তাঁদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বয়স যে কোনো বাধা নয়, সেই বার্তাই উঠে এসেছে।
কেন্দ্রভিত্তিক প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, মিঠাছরা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৪৯২ জন, মীরসরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২৮১ জন, জোরারগঞ্জ বৌদ্ধ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৬৮৩ জন, সরকারহাট নজরআলী রুপজান উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৪৪১ জন, বারৈয়ারহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩৩৭ জন এবং করেরহাট কামিনী মজুমদার উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩৫২ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণের জন্য তালিকাভুক্ত ছিলেন। ছয়টি কেন্দ্রের প্রকাশিত সংখ্যার যোগফল দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৮৬ জন। তবে আয়োজকদের দেওয়া মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৫৮৭ জন হওয়ায় এ ক্ষেত্রে একজনের পার্থক্য রয়েছে।
পরীক্ষা কার্যক্রম পরিদর্শন ও আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন মীরসরাই পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি বাবু সুভাষ সরকার, মীরসরাই পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অনির্বাণ চৌধুরী রাজীব, মীরসরাই সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের সভাপতি সোহাগ মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল চৌধুরী এবং সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-মানবাধিকার সম্পাদক মুন মহাজন। পুরো আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন রিপন গোপ পিন্টু। এ সময় আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও উপস্থিত থেকে পরীক্ষার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন।
পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ছয়টি কেন্দ্রেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে প্রবীণ পরীক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রবীণদের অংশগ্রহণ প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানচর্চার আগ্রহ, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাকে উৎসাহিত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আয়োজকদের মতে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার, জ্ঞানচর্চায় আগ্রহ সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনন বিকাশে এ ধরনের বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিভিন্ন বয়সী মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ আয়োজনের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে।
মীরসরাইয়ের ছয়টি কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণকে স্থানীয় সনাতনী শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের ব্যাপক সম্পৃক্ততার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন আয়োজকেরা। বিশেষ করে ৭৬ বছর বয়সী শোভা মল্লিকসহ প্রবীণ পরীক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবারের ‘বিদ্যার্থী বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৬’-কে একটি ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় আয়োজনে পরিণত করেছে।
মতামত