প্রথার পরিচয়
সতিদাহ প্রথা (যা সতীপ্রথা নামেও পরিচিত) হল এক ঐতিহাসিক প্রথা যেখানে বৈধব্যবরণকারী নারী স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দিতেন। এই প্রথা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ছিল, যা ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার আইন করে নিষিদ্ধ করে।
সনাতন ধর্মশাস্ত্রে অবস্থান
বেদ ও প্রাচীন সাহিত্য
1. ঋগ্বেদ: ঋগ্বেদে সতিদাহ প্রথার স্পষ্ট উল্লেখ নেই। কিছু মন্ত্রে (ঋগ্বেদ ১০.১৮.৭) স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর পুনর্বিবাহের কথা বলা হয়েছে, যা সতিপ্রথার বিপরীত ধারণা দেয়।
2. ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্র:
· মনুস্মৃতিতে (৫.১৫৭) বলা হয়েছে বিধবা নারী সদাচারে জীবনযাপন করবেন, কিন্তু সতিদাহের নির্দেশ নেই।
· বিষ্ণুস্মৃতি (২৫.১৪) ও পরাশর স্মৃতিতে বিধবার পুনর্বিবাহের অনুমতি রয়েছে।
পুরাণ ও পরবর্তী সাহিত্য
1. কিছু পুরাণে (যেমন অগ্নিপুরাণ, পদ্মপুরাণ) সতিদাহের উল্লেখ থাকলেও সেগুলো পরবর্তী সংযোজন বলে অনেক পণ্ডিত মনে করেন।
2. মহাকাব্যে:
· রামায়ণে রাজা দশরথের মৃত্যুর পর তার কোনো পত্নীই সতিদাহে যাননি।
· মহাভারতে পাণ্ডু ও মাদ্রীর কাহিনীতে মাদ্রী সতিদাহে যান, কিন্তু এটিকে ব্যতিক্রম হিসেবেই দেখা হয়।
ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
1. সনাতন ধর্মের মূলনীতি: সনাতন ধর্মের কেন্দ্রীয় ধারণা "अहिंसा परमो धर्मः" (অহিংসাই পরম ধর্ম)। অনেক পণ্ডিত যুক্তি দেন যে সতিদাহ এই মূলনীতির পরিপন্থী।
2. সংস্কৃত সাহিত্যের বিতর্ক: মেধাতিথি, ভাস্করাচার্য প্রমুখ ভাষ্যকারগণ সতিদাহকে "কাল্পনিক ধর্ম" বলেছেন এবং এর বিরোধিতা করেছেন।
ঐতিহাসিক বিকাশ
1. প্রাচীন যুগে এই প্রথা খুবই সীমিত ছিল
2. মধ্যযুগে কিছু রাজপুত ও উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ে প্রথাটি ছড়ায়
3. স্থানীয় সামাজিক প্রথা, নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ ও সম্পত্তির বিষয় প্রথাটিকে প্রভাবিত করেছে
সংস্কার আন্দোলন ও বিলোপ
1. রাজা রামমোহন রায় ১৮২৯ সালে বাংলায় সতিদাহ নিষিদ্ধকরণ আইনের জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করেন
2. তিনি বেদ, উপনিষদ ও স্মৃতিশাস্ত্র উদ্ধৃত করে প্রথার বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদান করেন
3. ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের সময় বাংলায় এবং পরে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে প্রথা নিষিদ্ধ হয়।
মতামত