চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমী ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একযোগে মোট ১৩টি পূজা মণ্ডপে সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হয়, যা ক্যাম্পাসে সৃষ্টি করেছে উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশ।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল থেকে দিনব্যাপী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে পূজা উদযাপন শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় চবি সনাতন ধর্ম পরিষদের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরে ‘শ্রীপঞ্চমীর শুভেচ্ছা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এরপর ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মণ্ডপে একে একে শুরু হয় বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা।
অতীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ছয়টি মণ্ডপে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ব্যবসায় প্রশাসন, কলা ও মানববিদ্যা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, মুক্তমঞ্চসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ উদ্যোগে পূজার আয়োজন করেন। পাশাপাশি চারুকলা ও নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরাও পৃথকভাবে পূজার আয়োজন করেন। ছাত্রীদের মধ্যে প্রীতিলতা ও ছাত্রদের মধ্যে অতীশ দীপঙ্করের নেতৃত্বে এসব পূজা আয়োজিত হয়।
আয়োজকরা জানান, সকালে যজ্ঞ ও আরাধনার মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে পুষ্পাঞ্জলি, বেদ ও গীতা পাঠ, প্রসাদ বিতরণ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় সন্ধ্যা আরতি। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে সরস্বতী নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে ‘সুরেশ্বরী বন্দনা-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
বিজ্ঞান অনুষদের পূজা মণ্ডপে উপস্থিত রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুজয় ভট্টাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এত বড় পরিসরে সরস্বতী পূজা এই প্রথম। দেবীকে মাতৃস্বরূপ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং মা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার গভীর সংযোগকে প্রতীকীভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মামার সঙ্গে পূজা মণ্ডপ ঘুরতে আসা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী উদিতা দে তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এই প্রথম মামার বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সরস্বতী পূজা উপভোগ করছেন তিনি। সবগুলো মণ্ডপ ঘুরে দেখে তার খুব ভালো লেগেছে।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সংহিতা দেবী জানান, বিজ্ঞান অনুষদে এই প্রথম সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হয়েছে। বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী হিসেবে সরস্বতীর আরাধনা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, সরস্বতী বিদ্যার দেবী হওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর পূজা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ধর্ম মানুষের মধ্যে কল্যাণবোধ জাগ্রত করে এবং ধর্মের সাথে সম্পর্ক থাকলে কেউ অকল্যাণকর কাজে জড়ায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী জানান, ক্যাম্পাসজুড়ে প্রতিটি পূজা মণ্ডপে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মণ্ডপসহ মোট ১৩টি মণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উৎসবমুখর পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও অভূতপূর্ব আয়োজনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সরস্বতী পূজা উদযাপনে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
মতামত